চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আবারও আরেক যুবদল নেতাকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ বলছে, গত বছরের আলোচিত যুবদল নেতা ইব্রাহিম হত্যা মামলার আসামি দিদারুল আলমের সম্পৃক্ততার তথ্য এবার রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের তদন্তেও উঠে এসেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলার সদর ইউনিয়নে যুবদল নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে দোকানে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার তদন্তে দিদারুল আলমকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরে একই বছরের ২০ অক্টোবর তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। এর আগেও একটি চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বের হওয়ার নজির রয়েছে তার।
সর্বশেষ গত ১৩ জুন রাউজানের বাগোয়ান এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরীকে। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে দিদারুল আলমের উপস্থিতির তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চুরি ও অন্যান্য অপরাধে অন্তত নয়টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হলেও তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে আসেন।
রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ইব্রাহিম হত্যা মামলায় দিদারুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বর্তমানে মাকসুদুল হত্যা মামলায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
নিহত মাকসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পিয়ারুল হক চৌধুরীর ছোট ভাই। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, মাকসুদুল কর্ণফুলী নদীসংলগ্ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বালুমহালের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। এসব বালুমহালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার সময় অন্তত পাঁচজন অস্ত্রধারী সরাসরি অংশ নেয়। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে শটগান এবং তিনজনের হাতে পিস্তল ছিল। গুলির মুখে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে একটি দোকানের সামনে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন মাকসুদুল। কিন্তু হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি চালায়। একপর্যায়ে কাছ থেকে গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের বেশ কয়েকজনের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। একজন মুখোশ পরা থাকলেও অন্যদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার সময় আতঙ্ক ছড়াতে হামলাকারীরা ফাঁকা গুলিও ছোড়ে এবং স্থানীয়দের দোকানপাট বন্ধ করতে বাধ্য করে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারী। অভিযুক্তদের মধ্যে দিদারুল আলম ছাড়াও ধামা ইলিয়াস, আফসার, ইউসুফ ও জাবেদের নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর পুলিশ মুহাম্মদ জাকির নামে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, সিসিটিভি ফুটেজে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৫ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাউজানে সহিংসতা বেড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, বালু ব্যবসা এবং রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যাকাণ্ডসহ গত ২২ মাসে রাউজানে অন্তত ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বড় অংশ রাজনৈতিক ও সন্ত্রাসী দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি হাসান মোহাম্মদ জসিম হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যারা এ ঘটনায় জড়িত, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























