কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সার্চ প্রযুক্তির যুগে তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে নতুন বিতর্কের মুখে পড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগল। ব্যবহারকারীদের দ্রুত তথ্য দিতে সার্চ ফলাফলের শুরুর দিকে ‘এআই ওভারভিউ’ নামে সংক্ষিপ্ত উত্তর দেখানোর সুবিধা চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই প্রযুক্তি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তার দায় কার—সে প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে জার্মানির একটি আদালত।
জার্মানির মিউনিখভিত্তিক দুটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করে, গুগলের এআই ওভারভিউ তাদের সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। ওই এআই সারাংশে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, গ্রাহকদের সাবস্ক্রিপশন ফাঁদে ফেলা এবং সন্দেহজনক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, এসব তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং তাদের সুনামের জন্য ক্ষতিকর।
বিষয়টি আদালতে গেলে বিচারকরা তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখতে পান, এআই ওভারভিউতে উপস্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তথ্য উপস্থাপন করলেও ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের দায় প্রযুক্তি কোম্পানি এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে এ ধরনের তথ্য প্রকাশের জন্য গুগলকেই দায় বহন করতে হবে।
রায়ের পর নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এআই ওভারভিউ মূলত ওয়েবে থাকা বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীদের জন্য সংক্ষিপ্ত সারাংশ তৈরি করে। গুগলের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ফিচার সঠিক ও কার্যকর তথ্য সরবরাহ করে থাকে। তবে ভুল তথ্য শনাক্ত হলে তা দ্রুত সংশোধনের জন্য তারা নিয়মিত কাজ করছে এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে।
তবে এআই ওভারভিউকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর আগে একাধিক ভুল তথ্য উপস্থাপনের ঘটনা উঠে এসেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একটি আলোচিত ঘটনায় দেখা যায়, লিভার ফাংশন টেস্ট সম্পর্কিত অনুসন্ধানে গুরুতর যকৃতের সমস্যার ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও এআই সেটিকে ‘স্বাভাবিক সীমার মধ্যে’ বলে উল্লেখ করেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ভুল তথ্য ব্যবহারকারীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ এতে রোগীরা নিজেদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারেন। পরে গুগল সংশ্লিষ্ট তথ্যের কিছু অংশ সংশোধন বা অপসারণ করে।
আরেকটি ঘটনায় অভিযোগ ওঠে, স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা সূত্রের পরিবর্তে ইউটিউব ভিডিও থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে উত্তর তৈরি করেছে এআই। ফলে তথ্যের উৎস, মান এবং নির্ভুলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।
বিশ্বজুড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ গুগল সার্চ ব্যবহার করেন। এত বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর কাছে এআই-নির্ভর তথ্য পৌঁছানোর কারণে ভুল তথ্যের সম্ভাব্য প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যপ্রযুক্তির ভবিষ্যৎ হলেও এর নির্ভরযোগ্যতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মিউনিখের আদালতের এই রায় প্রযুক্তি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এআইভিত্তিক তথ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই রায় নতুন ধরনের আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি ব্যবহারকারীদের সঠিক তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, ভুল তথ্যের দায় থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি মুক্ত নয়। আর সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে জার্মান আদালতের এই রায়।
রিপোর্টারের নাম 

























