দুর্গম ও বরফাবৃত পার্বত্য পথে সমস্ত রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন অদম্য বাংলাদেশি পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ইতিহাস পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের তৃতীয় নারী হিসেবে এভারেস্ট জয়ের এক অনন্য ও গৌরবময় কীর্তি স্থাপন করলেন তিনি। এর আগে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে ২০১২ সালের ১৯ মে এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করে ইতিহাস গড়েছিলেন নিশাত মজুমদার। একই বছরের ২৬ মে বিশ্বের এই সর্বোচ্চ শিখর জয় করেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। তাঁদের সেই ঐতিহাসিক অর্জনের পর দীর্ঘ ১৪ বছরের এক বিশাল বিরতি ও খরা কাটিয়ে অবশেষে আজ নতুন কোনো বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখলেন নুরুন্নাহার নিম্নি। বুধবার এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) নুরুন্নাহার নিম্নির এই অবিস্মরণীয় ও বীরত্বপূর্ণ এভারেস্ট জয়ের খবরটি দেশবাসীকে নিশ্চিত করেছে।
ক্লাবের পক্ষ থেকে দেওয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানানো হয় যে, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের চূড়ায় সফলভাবে আরোহণ করেছেন বাংলাদেশের সাহসী নারী পর্বতারোহী নুরুন্নাহার নিম্নি। আজ নেপালের স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে তিনি এভারেস্টের চূড়া স্পর্শ করে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান। নেপালের বিখ্যাত অভিযান ব্যবস্থাপনা সংস্থা ‘৮কে এক্সপেডিশন’ (8K Expedition) এর পক্ষ থেকে অ্যাঙ তেম্বা শেরপা আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুগান্তকারী ও গৌরবময় তথ্যটি বিশ্ব গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। এই বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন নিম্নি। সেখান থেকে কাঠমান্ডু হয়ে এবং পরে লুকলা দিয়ে হেঁটে তিনি পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। এরপর সেখানে বেশ কিছুদিন অবস্থান করে ধাপে ধাপে অতিউচ্চতার ও প্রতিকূল বরফশীতল পরিবেশের সঙ্গে নিজের শরীর ও মনকে মানিয়ে নেন তিনি। সাধারণত প্রতি বছর মে মাসের ১৫ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যবর্তী সময়টুকুকে এভারেস্ট সামিট বা চূড়ায় ওঠার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ধরা হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গত ১৭ মে চূড়ান্ত আরোহণের স্বপ্ন নিয়ে বেজক্যাম্প ছাড়েন তিনি। এরপর পাহাড়ি খাড়া পথ বেয়ে ধাপে ধাপে গত ২৩ মে সফলভাবে পৌঁছান ক্যাম্প–৪-এ। কিন্তু বিধি বাম, সেদিনই গভীর রাতে চূড়ান্ত শিখরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেও প্রকৃতির চরম খামখেয়ালিপনা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে তাকে আবার নিচে নেমে আসতে হয়।
তবে এই চরম প্রতিকূলতাও নিম্নির লৌহকঠিন মনোবলকে দমাতে পারেনি। এরপর অনুকূল আবহাওয়ার জন্য বুকভরা আশা নিয়ে কয়েকদিন ক্যাম্প–২-এ ধৈর্য ধরে অবস্থান করেন তিনি। পরবর্তীতে ২৫ মে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুকূলে আসামাত্রই তিনি আবারও নতুন উদ্যমে এভারেস্টের চূড়ার দিকে যাত্রা শুরু করেন এবং গতকাল সফলভাবে পৌঁছান ক্যাম্প–৪-এ। সেখান থেকেই একই দিন সন্ধ্যায় জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও চূড়ান্ত আরোহণ শুরু করে আজ নেপাল সময় সকাল ৫টা ২৪ মিনিটে এভারেস্টের সর্বোচ্চ শিখরে পা রাখতে সক্ষম হন তিনি। এই পুরো রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নেপালের এইটকে এক্সপেডিশনের একজন সুদক্ষ শেরপা সার্বক্ষণিক তার সঙ্গী হিসেবে পাশে ছিলেন। বর্তমানে পূবালী ব্যাংক পিএলসি–এর জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে অত্যন্ত সুনামের সাথে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন নুরুন্নাহার নিম্নি এবং গর্বের বিষয় হলো, তার এই ব্যয়বহুল ঐতিহাসিক অভিযানের মূল স্পনসরও ছিল তার কর্মস্থল এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটি। রংপুরের মনোরম পরিবেশে বেড়ে ওঠা নিম্নি উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ভূতত্ত্ব বিভাগে।
২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে অধ্যয়নকালীন সময়ে এক প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্ডওয়ার্কে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গিয়েই মূলত পাহাড়ের বিশালতা ও রোমাঞ্চের প্রতি এক গভীর ও অলঙ্ঘনীয় আকর্ষণ তৈরি হয় তার মনে। এরপর তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বিশাল ও স্মরণীয় সময় কেটেছে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে। পরবর্তীতে পড়াশোনা শেষ করে পেশাদার চাকরিজীবনে প্রবেশের পরও পাহাড়ের প্রতি তার সেই চিরন্তন টান বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং সুযোগ পেলেই তিনি ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন সুউচ্চ পাহাড়ে ট্রেকিং সম্পন্ন করেছেন। ২০১৯ সালে নেপালের বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পে ঘুরে আসার পর তার মনে আরও উঁচুতে ওঠার ও আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধে। এরপর ২০২০ সালে তিনি সফলভাবে করেন এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক। মূলত সেই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাকে পরবর্তীতে একজন পেশাদার পর্বতারোহণের দুর্গম পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে পর্বতারোহণের ওপর উচ্চতর পেশাদার প্রশিক্ষণ নেন তিনি। একই বছর তিনি যুক্ত হন দেশের খ্যাতনামা সংগঠন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে এবং মূলত এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের ব্যানারেই এবার একমাত্র এভারেস্ট অভিযানে অংশ নিয়ে বিশ্বজয় করেন নুরুন্নাহার নিম্নি।
পৃথিবীর এই সর্বোচ্চ শিখর মাউন্ট এভারেস্টে মানুষের প্রথম সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছিল আজ থেকে বহু বছর আগে, ১৯৫৩ সালে। ওই বছরের ২৯ মে নেপালের কিংবদন্তি শেরপা তেনজিং নোরগে–কে সঙ্গে নিয়ে প্রথমবার বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের চূড়ায় আরোহণ করে অমর হয়ে আছেন নিউজিল্যান্ডের কালজয়ী পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারি। এর অনেক বছর পর বাংলাদেশের হয়ে লাল-সবুজ পতাকাকে প্রথম এভারেস্টের চূড়ায় নিয়ে যান মুসা ইব্রাহীম, যিনি ২০১০ সালের ২৩ মে শিখরে আরোহণ করেন। এরপর ২০১১ ও ২০১২ সালে পরপর দুবার এভারেস্ট জয় করার অনন্য রেকর্ড গড়েন এম এ মুহিত। ২০১২ সালে একে একে এভারেস্ট জয় করেন নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীন। তবে ২০১৩ সালের ২০ মে এভারেস্টজয়ী পঞ্চম বাংলাদেশি হিসেবে সজল খালেদ শিখরে উঠলেও, দুর্ভাগ্যবশত চূড়া থেকে নিচে নামার পথে মারা যান তিনি। এরপর দীর্ঘ ১১ বছরের এক বড় বিরতি শেষে ২০২৪ সালে এভারেস্টের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান বাবর আলী। এরপর ২০২৫ সালে এক অভিনব ও অবিশ্বাস্য অভিযানে টেকনাফের কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট চূড়ায় ওঠার কীর্তি গড়েন ইকরামুল হাসান শাকিল। আর এবার ২০২৬ সালের এই নতুন মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র ও একক বীর অভিযাত্রী হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি।
রিপোর্টারের নাম 





















