মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা র্যাবের নাম পরিবর্তন করে এলিট ফোর্স গঠনের উদ্যোগ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। শুধু নাম বদল নাকি কাঠামোগত সংস্কার, কোনটি বেশি জরুরি, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মতামতের বিস্তারিত প্রতিবেদন।
একসময় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং একইসাথে ভরসার নাম। পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেষ ভরসা হিসেবে এই বাহিনীকে ডাকা হতো। কালো পোশাক, চোখে কালো চশমা এবং হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে তাদের উপস্থিতি চারপাশের পরিবেশে একধরনের নীরব আতঙ্ক তৈরি করত, যা শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও সাময়িকভাবে গা ঢাকা দিতে বাধ্য করত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এই এলিট ফোর্সের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হতে শুরু করে। বাহিনীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ঘুষ গ্রহণ, প্রতারণা, মুক্তিপণ আদায় এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠতে থাকে। সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের। ধীরে ধীরে জনমনে এমন একটি ধারণার জন্ম হয় যে, র্যাব মানেই গুম ও খুনের আতঙ্ক এবং বাহিনীটি কার্যত রাষ্ট্রের একটি জল্লাদ বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান সমালোচনার জেরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাব এবং এর কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার পর থেকে বাহিনীটি অনেকটা আড়ালেই চলে যায়।
সম্প্রতি র্যাবের বাইশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার নতুন আইনের আওতায় একটি নতুন এলিট ফোর্স গঠনের চিন্তাভাবনা করছে। তবে সেটি র্যাব নামেই থাকবে নাকি সম্পূর্ণ নতুন কোনো নামে আত্মপ্রকাশ করবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও মন্তব্য করেছেন যে, কয়েকজন বিপথগামী কর্মকর্তার দায়ভার পুরো প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে র্যাবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। নতুন নামে এবং নতুন কাঠামোতে বাহিনীটিকে ঢেলে সাজানো গেলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার জঙ্গিবাদ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে র্যাব গঠন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নামে অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই জঘন্য ধারা অব্যাহত ছিল। দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানালেও তৎকালীন সরকারগুলো তা আমলে নেয়নি। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ক্রসফায়ারের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ও র্যাবকে বিলুপ্ত করার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে। এর প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বাহিনীটির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা এসআইএফ নামে নতুন নামকরণের ঘোষণাও দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে মনে হতে পারে যে, র্যাবের মূল সমস্যা মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং বাহিনীর নামটিই প্রধান সমস্যা। যেন নাম পরিবর্তন করলেই অতীতের সব বিতর্ক ও অভিযোগ মুহূর্তের মধ্যে মুছে যাবে। অথচ মাথা ব্যথার সমাধান যেমন মাথা কেটে ফেলা হতে পারে না, তেমনি একটি বাহিনীর শুধু নাম পরিবর্তন করা প্রকৃত সংস্কারের পর্যায়ে পড়ে না। এখানে কার্যত এক মাথা খুলে অন্য মাথা বসানোর প্রক্রিয়া চলছে, যা পৌরাণিক কাহিনির গণেশের মাথা পরিবর্তনের ঘটনার সাথে তুলনীয়। শিবের ক্রোধে কাটা পড়া গণেশের দেহে হাতির মাথা বসানোর মতো অলৌকিক ঘটনা কেবল পৌরাণিক গল্পেই মানানসই।
কিন্তু বাস্তব জীবনে শুধু মাথার পরিবর্তন বা পোশাকের রঙ বদলালেই কোনো বাহিনীর মূল চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে না। এসআইএফ নাম দিলেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা আমেরিকা সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি ভ্রান্ত ধারণা। বর্তমানে দেশে এমন এক শাসননীতি চালু হয়েছে যেখানে সমস্যার প্রকৃত সমাধানের বদলে শুধু সমস্যার নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং বাহ্যিক রূপচর্চার মাধ্যমে ভেতরের ক্ষত ঢাকার চেষ্টা চলছে। যখন কোনো বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তখন কাঠামোগত সংস্কারের বদলে লোগো ডিজাইনার ও গালভরা ইংরেজি নাম খোঁজার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশা আগের মতোই অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে।
যদি সত্যিই গুটিকয়েক কর্মকর্তা অপরাধের সাথে জড়িত থাকেন, তবে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনাই হতো সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ। এতে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা পেত এবং জনমনে হারানো আস্থা ফিরে আসত। কিন্তু তা না করে পুরো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের এই তোড়জোড় প্রমাণ করে যে সমস্যা শুধু ব্যক্তিতে নয়, বরং গলদটা কাঠামোর গভীরে নিহিত। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র বারবার জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দিলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শুধু নতুন নামের খোঁজ চলছে। আজ র্যাবের নাম বদলাবে, কাল পুলিশের পোশাক বদলাবে এবং হয়তো পরশু থানায় নতুন রঙ লাগবে, কিন্তু সাধারণ নাগরিকের মনে যে ভয় গেঁথে আছে তা দূর হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মাঝরাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলে মানুষের বুকের কাঁপন থামবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাষ্ট্রযন্ত্র যতক্ষণ না এই সাইনবোর্ড পরিবর্তনের সংস্কৃতির বাইরে এসে সত্যিকারের কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারে হাত দেবে, ততক্ষণ এই ধরনের রূপান্তর কেবলই একটি ব্যয়বহুল তামাশা হিসেবে পরিগণিত হবে। র্যাবের এই নাম বদলের উদ্যোগটি সেই পুরোনো গল্পের মাতালের মতোই শোনায়, যে কিনা নিজেকে শুদ্ধ করার জন্য তিনবার জলে ডুব দিয়ে নিজের নাম রাখে শাশ্বত এবং বাড়িতে ফিরে বিয়ারের বোতলকে জলে চুবিয়ে তার নাম দেয় গ্রিন টি। এরপর সেই তথাকথিত শুদ্ধ মাতাল পরম তৃপ্তিতে গ্রিন টি রূপী বিয়ার পান করতে থাকে।
রিপোর্টারের নাম 






















