ঢাকা ০৭:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নীল ড্রামে ২৬ খণ্ড মরদেহ : ত্রিভুজ প্রেমের বলি ব্যবসায়ী

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছ থেকে গত বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ খণ্ডে খণ্ডিত মরদেহ দুটি নীল ড্রাম থেকে উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে ত্রিভুজ প্রেমের জটিলতা উঠে এসেছে।

এই ঘটনায় নিহত আশরাফুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জরেজুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জরেজুল এবং তার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত শামীমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খুনের নেপথ্যে ত্রিভুজ প্রেম

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বিবাহিত নারী শামীমা আক্তারের সঙ্গে আশরাফুল হক এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী জরেজুল ইসলাম দুই বন্ধুরই পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের টানাপোড়েনই তাদের বহুদিনের বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে।

ডিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আশরাফুলকে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে এবং পরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। খুনের দুই দিন পর তার মরদেহ ২৬টি টুকরায় কেটে দুটি ড্রামে ভরে ফেলা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে জরেজুল ও শামীমা দুজনই অংশ নিয়েছিলেন।

যেভাবে গ্রেপ্তার হলো দুই অভিযুক্ত

শুক্রবার (১৪ মে) রাতে ডিবি কুমিল্লা থেকে জরেজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে, র‍্যাব-৩ শামীমাকে লাকসাম থেকে গ্রেপ্তার করে।

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, শামীমা আক্তার কুমিল্লার বাসিন্দা। তার স্বামী সৌদি আরবে থাকেন এবং তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে ফেসবুকে জরেজুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যা পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রূপ নেয়।

হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ

আশরাফুল ও জরেজুল দুজনেই রংপুরের একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। জরেজুলের মাধ্যমেই শামীমার সঙ্গে আশরাফুলের পরিচয় ঘটে এবং পরবর্তীতে আশরাফুলের সঙ্গেও শামীমার পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি হয়।

ডিবি জানায়, জরেজুল ঢাকায় দক্ষিণ ধনিয়ায় একটি বাসা ভাড়া নেন এবং শামীমা তার ছেলে-মেয়েকে কুমিল্লায় রেখে সেই বাসায় ওঠেন। সেখানেই ঘটনার সূত্রপাত। একসময় জরেজুল আশরাফুল ও শামীমার শারীরিক সম্পর্ক দেখে ফেলেন। ক্ষিপ্ত হয়ে জরেজুল বাসা থেকে বের হয়ে যান, তবে ভুলবশত আশরাফুলের মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরে তিনি বাসায় ফিরে এসে দেখেন আশরাফুল ও শামীমা একই বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন। জরেজুল ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকেন। রাতে পুনরায় তাদের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। ক্ষোভের বশে তিনি আশরাফুলকে বালিশ চাপা দিয়ে ধরেন। তখন শামীমাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মাথায় হাতুড়ি মেরে আশরাফুলকে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর মরদেহটি দুই দিন ধরে সেই বাসাতেই রাখা হয়। এরপর তারা দুজন মিলে মরদেহটি ২৬টি খণ্ডে কাটেন এবং ড্রামে ভরে ঈদগাহের সামনে ফেলে রেখে দুজনই কুমিল্লায় পালিয়ে যান।

তদন্ত ও ময়নাতদন্তের তথ্য

স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ড্রাম থেকে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। সিআইডি পরবর্তীতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে আশরাফুলের পরিচয় শনাক্ত করে। এরপরই ডিবি তদন্ত শুরু করে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম নিশ্চিত করেন, ত্রিভুজ পরকীয়া থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রযুক্তির সাহায্যে দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. দীপিকা রায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, গলা থেকে নিচের ২৫টি অংশ এবং মাথা মিলিয়ে মোট ২৬ খণ্ড মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহের গলার নিচের অনেক অংশই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ

ঘটনার পরদিন আশরাফুলের বোন আনজিনা বেগম শাহবাগ থানায় মামলা করেন। এজাহারে তিনি জানান, ১১ নভেম্বর রাত ৮টায় জরেজুলের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকেই তাঁর ভাইয়ের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড্রামে মরদেহ উদ্ধারের খবর দেখে তারা হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।

আশরাফুলের স্ত্রী লাকী বেগম জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা ধার চাইতে জরেজুল তাঁর স্বামীকে চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসে খুন করেছে। আমি তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে সহিংসতায় প্রাণহানি: দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

নীল ড্রামে ২৬ খণ্ড মরদেহ : ত্রিভুজ প্রেমের বলি ব্যবসায়ী

আপডেট সময় : ০৮:১৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০২৫

রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছ থেকে গত বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ খণ্ডে খণ্ডিত মরদেহ দুটি নীল ড্রাম থেকে উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে প্রাথমিক তদন্তে ত্রিভুজ প্রেমের জটিলতা উঠে এসেছে।

এই ঘটনায় নিহত আশরাফুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জরেজুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জরেজুল এবং তার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত শামীমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খুনের নেপথ্যে ত্রিভুজ প্রেম

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বিবাহিত নারী শামীমা আক্তারের সঙ্গে আশরাফুল হক এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী জরেজুল ইসলাম দুই বন্ধুরই পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কের টানাপোড়েনই তাদের বহুদিনের বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে।

ডিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আশরাফুলকে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে এবং পরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। খুনের দুই দিন পর তার মরদেহ ২৬টি টুকরায় কেটে দুটি ড্রামে ভরে ফেলা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে জরেজুল ও শামীমা দুজনই অংশ নিয়েছিলেন।

যেভাবে গ্রেপ্তার হলো দুই অভিযুক্ত

শুক্রবার (১৪ মে) রাতে ডিবি কুমিল্লা থেকে জরেজুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। অন্যদিকে, র‍্যাব-৩ শামীমাকে লাকসাম থেকে গ্রেপ্তার করে।

ডিবির তথ্য অনুযায়ী, শামীমা আক্তার কুমিল্লার বাসিন্দা। তার স্বামী সৌদি আরবে থাকেন এবং তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রায় তিন বছর আগে ফেসবুকে জরেজুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যা পরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রূপ নেয়।

হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ

আশরাফুল ও জরেজুল দুজনেই রংপুরের একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। জরেজুলের মাধ্যমেই শামীমার সঙ্গে আশরাফুলের পরিচয় ঘটে এবং পরবর্তীতে আশরাফুলের সঙ্গেও শামীমার পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি হয়।

ডিবি জানায়, জরেজুল ঢাকায় দক্ষিণ ধনিয়ায় একটি বাসা ভাড়া নেন এবং শামীমা তার ছেলে-মেয়েকে কুমিল্লায় রেখে সেই বাসায় ওঠেন। সেখানেই ঘটনার সূত্রপাত। একসময় জরেজুল আশরাফুল ও শামীমার শারীরিক সম্পর্ক দেখে ফেলেন। ক্ষিপ্ত হয়ে জরেজুল বাসা থেকে বের হয়ে যান, তবে ভুলবশত আশরাফুলের মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরে তিনি বাসায় ফিরে এসে দেখেন আশরাফুল ও শামীমা একই বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন। জরেজুল ঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকেন। রাতে পুনরায় তাদের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারেননি। ক্ষোভের বশে তিনি আশরাফুলকে বালিশ চাপা দিয়ে ধরেন। তখন শামীমাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মাথায় হাতুড়ি মেরে আশরাফুলকে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর মরদেহটি দুই দিন ধরে সেই বাসাতেই রাখা হয়। এরপর তারা দুজন মিলে মরদেহটি ২৬টি খণ্ডে কাটেন এবং ড্রামে ভরে ঈদগাহের সামনে ফেলে রেখে দুজনই কুমিল্লায় পালিয়ে যান।

তদন্ত ও ময়নাতদন্তের তথ্য

স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ড্রাম থেকে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। সিআইডি পরবর্তীতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে আশরাফুলের পরিচয় শনাক্ত করে। এরপরই ডিবি তদন্ত শুরু করে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম নিশ্চিত করেন, ত্রিভুজ পরকীয়া থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রযুক্তির সাহায্যে দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. দীপিকা রায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়, গলা থেকে নিচের ২৫টি অংশ এবং মাথা মিলিয়ে মোট ২৬ খণ্ড মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহের গলার নিচের অনেক অংশই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।

পরিবারের অভিযোগ

ঘটনার পরদিন আশরাফুলের বোন আনজিনা বেগম শাহবাগ থানায় মামলা করেন। এজাহারে তিনি জানান, ১১ নভেম্বর রাত ৮টায় জরেজুলের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর থেকেই তাঁর ভাইয়ের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ড্রামে মরদেহ উদ্ধারের খবর দেখে তারা হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন।

আশরাফুলের স্ত্রী লাকী বেগম জানান, বিদেশ যাওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা ধার চাইতে জরেজুল তাঁর স্বামীকে চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে এসে খুন করেছে। আমি তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।