ঢাকা ০৬:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার দশকের রক্তক্ষয়ী ছাত্ররাজনীতি: ৩৩ শিক্ষার্থী খুনের পরিসংখ্যান ও নেপথ্য ইতিহাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইতিহাসে ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার দশকে ছাত্রসংগঠনগুলোর সহিংসতায় মোট ৩৩ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের, যাদের ১৯ জন নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭ জন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ২ জন এবং বামপন্থী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ৪ জন শিক্ষার্থী খুন হয়েছেন।

১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবিরের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে হামলার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে প্রথম খুনের রাজনীতির সূচনা হয়, যেখানে চারজন শিবিরকর্মী নিহত হন। এরপর ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ সংঘর্ষে ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের একাধিক নেতা প্রাণ হারান। এমনকি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাতের জেরে ছাত্রলীগের নিজস্ব বেশ কয়েকজন কর্মীসহ মোট ৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হন।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই ৩৩টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়, ক্ষমতার পালাবদল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবকে বিচারহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০৯ সালে শাখা শিবিরের সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানী হত্যাকাণ্ডের ২৭ জন আসামির সবাই খালাস পাওয়া এবং ২০১৪ সালে ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ হত্যা মামলার ১২ আসামির অব্যাহতি পাওয়া বিচারিক ব্যর্থতার বড় উদাহরণ।

এছাড়া ২০১৬ সালে শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর রহস্যজনক মৃত্যুর কিনারা আজও করতে পারেনি পুলিশ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে ছাত্ররাজনীতির নতুন ধারায় অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হওয়া উচিত, যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

সংগঠনভিত্তিক নিহতের সংখ্যা:

সংগঠননিহতের সংখ্যা
ইসলামী ছাত্রশিবির১৯ জন
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ০৭ জন
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল০২ জন
বাম ছাত্র সংগঠনসমূহ০৪ জন
অন্যান্য/অচিহ্নিত০১ জন
মোট৩৩ জন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, বর্তমানে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না হলেও সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দও অতীত হিংসা ভুলে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়, গুপ্তহত্যা ও অস্ত্রের রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা: সরকার বদলেও একই বঞ্চনা, বলছেন সম্পাদক মাহমুদুর রহমান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার দশকের রক্তক্ষয়ী ছাত্ররাজনীতি: ৩৩ শিক্ষার্থী খুনের পরিসংখ্যান ও নেপথ্য ইতিহাস

আপডেট সময় : ১২:৪৯:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইতিহাসে ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার দশকে ছাত্রসংগঠনগুলোর সহিংসতায় মোট ৩৩ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী ইসলামী ছাত্রশিবিরের, যাদের ১৯ জন নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭ জন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ২ জন এবং বামপন্থী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ৪ জন শিক্ষার্থী খুন হয়েছেন।

১৯৮২ সালের ১১ মার্চ শিবিরের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে হামলার মাধ্যমে ক্যাম্পাসে প্রথম খুনের রাজনীতির সূচনা হয়, যেখানে চারজন শিবিরকর্মী নিহত হন। এরপর ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ সংঘর্ষে ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের একাধিক নেতা প্রাণ হারান। এমনকি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাতের জেরে ছাত্রলীগের নিজস্ব বেশ কয়েকজন কর্মীসহ মোট ৬ জন শিক্ষার্থী নিহত হন।

তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই ৩৩টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি কোনোটিরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি। রাজনৈতিক আশ্রয়, ক্ষমতার পালাবদল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবকে বিচারহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০৯ সালে শাখা শিবিরের সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানী হত্যাকাণ্ডের ২৭ জন আসামির সবাই খালাস পাওয়া এবং ২০১৪ সালে ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী আকন্দ হত্যা মামলার ১২ আসামির অব্যাহতি পাওয়া বিচারিক ব্যর্থতার বড় উদাহরণ।

এছাড়া ২০১৬ সালে শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর রহস্যজনক মৃত্যুর কিনারা আজও করতে পারেনি পুলিশ। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, জুলাই পরবর্তী সময়ে ছাত্ররাজনীতির নতুন ধারায় অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হওয়া উচিত, যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

সংগঠনভিত্তিক নিহতের সংখ্যা:

সংগঠননিহতের সংখ্যা
ইসলামী ছাত্রশিবির১৯ জন
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ০৭ জন
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল০২ জন
বাম ছাত্র সংগঠনসমূহ০৪ জন
অন্যান্য/অচিহ্নিত০১ জন
মোট৩৩ জন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, বর্তমানে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না হলেও সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দও অতীত হিংসা ভুলে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়, গুপ্তহত্যা ও অস্ত্রের রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।