দেশের রেলপথের লেভেল ক্রসিংগুলো বর্তমানে এক একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য বারবার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দায়ী করা হলেও এর মূলে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা, অবৈধ ক্রসিংয়ের আধিক্য এবং প্রযুক্তির অভাব। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশের অধিকাংশ লেভেল ক্রসিংই অরক্ষিত, যেখানে নেই কোনো স্থায়ী গেইটম্যান কিংবা কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।
লেভেল ক্রসিংয়ের নাজুক চিত্র
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রচুর লেভেল ক্রসিং থাকলেও তার মাত্র ২০-২৫ শতাংশে গেইটম্যান আছে। একটি বড় অংশ রেলের অনুমোদন ছাড়াই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে।
- অবৈধ ক্রসিং: সারাদেশে অন্তত ১,৩২১টি অবৈধ রেলক্রসিং আছে। এর মধ্যে এলজিইডি ও ইউনিয়ন পরিষদ ৯৬০টি, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন ১৭০টি এবং সওজ ১২টি তৈরি করেছে।
- জনবল সংকট: অনুমোদিত ক্রসিংগুলোর মধ্যেও অনেকগুলোতে স্থায়ী গেইটম্যান নেই। ফলে অধিকাংশ সময় পথচারী ও যানবাহন চালকরা নিজ ঝুঁকিতে লাইন পার হন।
দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান
বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রেল দুর্ঘটনার সিংহভাগই ঘটে লেভেল ক্রসিংয়ে। ২০২৪ সালেই ২৫৩টি দুর্ঘটনায় ২৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
| সাল | দুর্ঘটনার সংখ্যা | নিহতের সংখ্যা | আহত |
| ২০১৮-১৯ | ৯১ | ১৫ | ৪১ |
| ২০১৯-২০ | ৮০ | ৩৮ | ১০৬ |
| ২০২০-২১ | ১১১ | ৩৭ | ১৬ |
| ২০২৪ (পুরো বছর) | ২৫৩ | ২৩০ | ২৩৮ |
| ২০২৬ (মার্চ মাস) | ৪৮ | ৬৭ | ২২৪ |
কেন ঘটছে এসব দুর্ঘটনা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
- সতর্কীকরণ ব্যবস্থার অভাব: অনেক জায়গায় সতর্কীকরণ বাতি বা সাইরেন নষ্ট থাকে, এমনকি গেইটম্যানদের থাকার জায়গাটুকুও ন্যূনতম সুবিধাবঞ্চিত।
- অবৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ গঠন: নিয়মবহির্ভূতভাবে রাস্তা তৈরির ফলে রেললাইন অনেক সময় সড়কের চেয়ে উঁচুতে থাকে, যা ভারী যানবাহন চলাচলের সময় ঝুকি বাড়ায়।
- তদারকির অভাব: কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের মতো ঘটনায় দেখা গেছে, মূল গেইটম্যানের বদলে ভাড়া করা লোক দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, যার খবর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানে না।
- বিনিয়োগের ভুল খাত: রেলখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও লেভেল ক্রসিংয়ের অটোমেশন বা আধুনিকায়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞ অভিমত: অধ্যাপক হাদিউজ্জামানের মতে, রেলের মোট বিনিয়োগের মাত্র ২ শতাংশ যদি অটোমেশনে ব্যয় করা হতো, তবে মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। শুধু গেইটম্যান বরখাস্ত করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
প্রতিকারের উপায় ও বর্তমান উদ্যোগ
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ গেইটগুলোতে সাইরেন ও ঘণ্টার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এছাড়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নিয়মিত গেইটম্যানদের তদারকি করা হচ্ছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- অটোমেশন: ডিজিটাল সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার স্থাপন।
- আন্ডারপাস ও ওভারপাস: গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সড়ক ও রেলপথকে আলাদা স্তরে নিয়ে যাওয়া (যেমন দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পে করা হয়েছে)।
- সমন্বিত পরিকল্পনা: এলজিইডি, সওজ এবং রেলওয়ের মধ্যে সমন্বয় করে অবৈধ ক্রসিং বন্ধ করা।
- জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ: দক্ষ গেইটম্যান নিয়োগ এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
রিপোর্টারের নাম 
























