পাড়ার ক্রিকেট কিংবা আন্তর্জাতিক ম্যাচ—বোলিং ক্রিজে বোলারের পা দাগের বাইরে চলে গেলেই আম্পায়ারের আঙুল ওঠে ‘নো বল’-এর। ক্রিকেটের এই সবচেয়ে সাধারণ নিয়মটিই ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডসের সবুজ গালিচায় রূপ নিয়েছিল এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও সাজানো চিত্রনাট্যে। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর গোপন অনুসন্ধানী ক্যামেরায় জুয়াড়ি ও এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে লেনদেনের প্রমাণ মেলার পর উন্মোচিত হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে সাজা ঘোষণার মাধ্যমে আইনি চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছিল পাকিস্তানের তৎকালীন অধিনায়ক সালমান বাট, পেস তারকা মোহাম্মদ আসিফ ও তরুণ প্রতিভা মোহাম্মদ আমিরের ক্রিকেট ক্যারিয়ার। আজ সেই কলঙ্কিত অধ্যায়ের সাজা ঘোষণার ১৫ বছর পূর্ণ হলো।
লর্ডস টেস্টে মাজহার মাজিদের দেওয়া আগাম তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে আমিরের পা ক্রিজের দাগ পেরিয়ে প্রায় আধা মিটার বাইরে যায় এবং দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে একই কাণ্ড ঘটান আসিফ। ম্যাচ বা পুরো ফলাফল নয়, বরং নির্দিষ্ট মুহূর্তে একটি মাত্র বলের ওপর জুয়াড়িদের কোটি টাকার লেনদেন নিশ্চিত করতেই রচিত হয়েছিল এই চিত্রনাট্য। ভিডিও ফাঁসের পর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তদন্ত এবং পরবর্তীতে আইসিসির ট্রাইব্যুনাল বাটকে ১০ বছর (৫ বছর স্থগিত), আসিফকে ৭ বছর (২ বছর স্থগিত) এবং আমিরকে ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। এরপর ব্রিটিশ আদালত সালমান বাটকে আড়াই বছর, আসিফকে এক বছর ও আমিরকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।
কারাগারের মেয়াদ শেষ ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে ক্রিকেটে ফেরার অনুমতি মিললেও তিন ক্রিকেটারের জীবনের মোড় গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে অসাধারণ সুইং দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বিস্ময় জাগানো মোহাম্মদ আমিরের ফেরাটা ছিল সবচেয়ে কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ। জাতীয় দলের সতীর্থদের তীব্র আপত্তি ও বৈরী পরিবেশ সামলে ২০১৬ সালে তিনি জাতীয় দলে ফেরেন। ২০১৯ সালে টেস্ট এবং ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর পর অবসর ভেঙে ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও মাঠে নামেন। ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগে ৪০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়া আমির সম্প্রতি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেয়ে কাউন্টিতে স্থানীয় খেলোয়াড় হিসেবে খেলছেন এবং ব্রিটিশ পাসপোর্টের সুবাদে তাঁর জন্য আইপিএলের দরজাও উন্মুক্ত হওয়ার গুঞ্জন চলছে।
অন্যদিকে, সাবেক অধিনায়ক সালমান বাট প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে শতক হাঁকিয়ে ফিরেছিলেন ঠিকই, তবে জাতীয় দলের দুয়ার তাঁর জন্য আর খোলেনি। বর্তমানে তিনি ইউটিউব বিশ্লেষণ ও টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার হিসেবে সক্রিয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পিসিবির নির্বাচক প্যানেলের পরামর্শক পদে নিযুক্ত হলেও জনমতের তীব্র তোপের মুখে পরদিনই তাঁকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয় বোর্ড। সবচেয়ে ট্র্যাজিক পরিণতি হয়েছে মোহাম্মদ আসিফের। বলকে দুই দিকে মুভ করানোর জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী এই পেসার ২২ টেস্টেই নিয়েছিলেন ১০৫ উইকেট। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে তিনি আর কখনোই মূলধারায় ফিরতে পারেননি; বরং আক্ষেপ নিয়েই ক্রিকেটের আলো থেকে পুরোপুরি নির্বাসনে চলে গেছেন।
লর্ডসের এই কলঙ্কিত ঘটনার পর আইসিসি তাদের দুর্নীতিবিরোধী ইউনিটকে (আকসু) কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় এবং খেলোয়াড়দের জুয়াড়িদের প্রস্তাব অবিলম্বে জানানোর বাধ্যবাধকতা চালু করে। তবে এরপরও শারজিল খান বা উমর আকমলের মতো ঘটনা প্রমাণ করেছে যে কেবল কঠোর আইন দিয়ে জুয়াড়িদের এই অদৃশ্য জাল পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। ১৫ বছর আগের সেই তিনটি নো বল শুধু পাকিস্তানের তিনজন তারকার জীবনই ধ্বংস করেনি, ক্রিকেটের সবচেয়ে মৌলিক বিশ্বাসকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে দাগের ওপারে পা ফেলার সেই সাধারণ দৃশ্যে আজও ক্রিকেটভক্তরা কখনো কখনো খোঁজার চেষ্টা করেন কোনো লুকানো চিত্রনাট্য।

























