মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
১০:০৯ অপরাহ্ন | ৫ই নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ২০শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

ইতালি সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও নৌ-অবরোধ: চরম ঝুঁকিতে অবৈধ পথে পা বাড়ানো বাংলাদেশিরা

  • হালনাগাদ সময় : ০২:১২:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

অননুমোদিত ও অবৈধ অভিবাসন স্থায়ীভাবে প্রতিহত করতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ইতালি সরকার। কাগজপত্রহীন অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক নজরদারি জোরদার করা এবং প্রয়োজনে কার্যকর নৌ-অবরোধ আরোপের মতো অত্যন্ত কঠোর বিধান সংযুক্ত করে নতুন অভিবাসন সংক্রান্ত বিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মন্ত্রিসভা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত এই সামগ্রিক সংস্কার প্যাকেজের সুস্পষ্ট লক্ষ্য মূলত দুটি—একদিকে কঠোর হস্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদের ‘ফ্লো ডিক্রি’র মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা। ফলে মধ্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা চালানো বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি চরম সংকট ও আশঙ্কার মুখে পড়তে যাচ্ছে।

ইতালির নতুন ডিক্রি-আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশটিতে বসবাসকারীদের বহিষ্কারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনেক বেশি সহজ ও দ্রুততর করা হবে। সেই সঙ্গে আশ্রয়ের আবেদনের (অ্যাসাইলাম) নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ চার মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যতিক্রমী সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এবং জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার গুরুতর হুমকি দেখা দিলে ইতালির নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় অভিবাসীবাহী যেকোনো জাহাজ বা নৌকা সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত আটকে রাখার এখতিয়ার পাবে। পাশাপাশি দেশের আঞ্চলিক জলসীমায় অননুমোদিত যেকোনো নৌকা প্রবেশের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারির নিরঙ্কুশ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে সরকারকে।

অবৈধ অভিবাসীদের আটকে রাখা ও বহিষ্কার কার্যক্রম কার্যকর করতে ইতিমধ্যে আলবেনিয়ার সঙ্গে কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন করে রেখেছে ইতালি। এই চুক্তির আওতায় আলবেনিয়ায় স্থাপিত দুটি বিশেষ ক্যাম্প বর্তমানে প্রত্যাখ্যাতদের ‘রিটার্ন হাব’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার এই বিতর্কিত ইতালীয় মডেলটি এখন পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নই অনুসরণ করার পথে হাঁটছে। গত ১২ জুন কার্যকর হওয়া ইইউর নতুন ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’-এও প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।

ইতালি সরকারের ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে এসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে জানিয়েছে, ইতালি একটি দমনমূলক মডেল অনুসরণ করছে এবং আলবেনিয়ায় আটক রেখে মানুষকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া মৌলিক মানবাধিকারকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। বিলটি বর্তমানে ইতালির পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে; এটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান ঠেকাতে ইতালি কোনো ছাড় দেবে না। লিবিয়া হয়ে সাগরপথে মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে বৈধ পথে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে পাড়ি দেওয়াই সফলতার একমাত্র উপায় নয়। তাই প্রতারক দালালদের কথায় প্রলুব্ধ না হয়ে সরকারি নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, কেবল ইতালির ক্ষেত্রে নয়, সব দেশের জন্যই সরকার বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করে; কারণ অবৈধ অনুপ্রবেশ দেশের বৈশ্বিক মর্যাদাকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করে।

বিপজ্জনক সাগরপথের বিপরীতে বৈধ পথে ইতালিতে কর্মী যাওয়ার সুযোগ কিন্তু সম্প্রসারিত হচ্ছে। রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো জানান, বাংলাদেশিদের জন্য সরকারি নির্ধারিত কোটার বাইরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করে ইতালি নেওয়ার একটি নতুন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ইতালি দূতাবাসের তথ্যমতে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সরকারি ‘ডেক্রেতো ফ্লুসি’ কোটায় মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়া হবে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন কর্মী নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অনিয়মিত অভিবাসী প্রত্যাবাসনে সার্বিক সহযোগিতা বজায় রাখার কারণে বাংলাদেশ এই নিয়মিত কোটার সংরক্ষিত সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের তালিকায় রয়েছে। এর বাইরে সবচেয়ে বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর ধারার অধীনে। এই ধারার আওতায় ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ (যার মধ্যে ইতালীয় ভাষা, নাগরিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক কারিগরি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত) দেশে বসেই সম্পন্ন করলে কোটার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই সারা বছর যে কেউ বৈধভাবে কর্মসংস্থান নিয়ে ইতালি যেতে পারবেন। এই প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবেন ইতালীয় নিয়োগকর্তা; ফলে কর্মীকে কোনো দালালকে একটি পয়সাও দিতে হবে না। এমনকি কোনো প্রার্থী দালালকে অর্থ দিয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তাঁর ভিসা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে।

এদিকে ইতালির সঙ্গে সম্পাদিত অভিবাসন চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে চলমান জল্পনা নাকচ করে দিয়েছেন আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইউরোনিউজ এনলার্জমেন্ট সামিটে তিনি ঘোষণা দেন, রোম যতদিন প্রয়োজন মনে করবে, ততদিনই এই চুক্তি বহাল থাকবে। ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০২৪ সালের মার্চে কার্যকর হওয়া এই পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে মূলত ইইউর নিজস্ব সীমানার বাইরে অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আউটসোর্স করা হচ্ছে। যদিও আলবেনিয়ার শেনজিন ও জাদেরে স্থাপিত কেন্দ্র দুটিতে বর্তমানে শতাধিক ব্যক্তি অবস্থান করছেন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে প্রথম দুই বছরে প্রতিটি ব্যক্তির পেছনে ইতালির ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ইউরো। পূর্বে উদ্ধার হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্র দুটি তৈরির কথা থাকলেও পরবর্তীতে মেলোনি সরকার নীতি পরিবর্তন করে ইতালি থেকে সরাসরি বহিষ্কারযোগ্যদের সেখানে সাময়িক আটকে রাখার কাজে ব্যবহার শুরু করে।

বাস্তবতা হলো, উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশিরাই। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়া থেকে ইতালি ও মাল্টার উদ্দেশে সাগর পাড়ি দেওয়ার মোট ১ লাখ ৭৭৭টি প্রচেষ্টার মধ্যে ২২ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। শুধু ইতালির মাটিতে পৌঁছানো ৬৫ হাজার ৮১ জন অভিবাসীর মধ্যে ৩১ দশমিক ১ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি, যা সব দেশের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ। এরপর অবস্থান ছিল মিশরীয় (১৪%), ইরিত্রীয় (১১.৭%) এবং পাকিস্তানি (৬.৭%) নাগরিকদের। এছাড়া মাল্টায় পৌঁছানো ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। এসব বাংলাদেশির ৯২ শতাংশই পুরুষ এবং মাত্র ৭ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক, যা প্রমাণ করে এই যাত্রা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও শ্রমপ্রত্যাশী অভিবাসন।

তবে এই যাত্রা প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। আইওএমের মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ২০ হাজারের বেশি মানুষের সলিলসমাধি ঘটেছে, যার মধ্যে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথেই মৃত্যু ও নিখোঁজ হয়েছেন ১৭ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে এ পথে ১ হাজার ৭৫৪ জন এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩৩০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। আর চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এই পথে ১ হাজার ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন বা সাগরে চিরতরে হারিয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে বহুসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। লিবিয়ায় অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় ও আধুনিক দাসত্বের মতো অবর্ণনীয় নিপীড়ন পেরিয়ে বহু মানুষ নৌকায় উঠলেও দুর্বল ও অতিরিক্ত বোঝাই বোটগুলোর ডুবে যাওয়া এবং ভেসে আসা অজ্ঞাত মরদেহের কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, সারা দেশের মানুষ এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যায় না; মূলত শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী ও কুমিল্লার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে তরুণরা পাচারকারীদের লোভনীয় মিথ্যে আশ্বাসে পা বাড়ায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দালালদের চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের পথ বন্ধ করা এবং লিবিয়াসহ ট্রানজিট দেশগুলোর মানবপাচার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করাই এই প্রাণঘাতী যাত্রা বন্ধের প্রধান উপায়।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

আকাশছোঁয়া খরচ ও চড়া ট্যাক্সের জাঁতাকল: জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা

05 November 2026

প্রথমবারের মতো কুবিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় স্নাতক গণিত অলিম্পিয়াড

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

ইতালি সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও নৌ-অবরোধ: চরম ঝুঁকিতে অবৈধ পথে পা বাড়ানো বাংলাদেশিরা

হালনাগাদ সময় : ০২:১২:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

অননুমোদিত ও অবৈধ অভিবাসন স্থায়ীভাবে প্রতিহত করতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ইতালি সরকার। কাগজপত্রহীন অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক নজরদারি জোরদার করা এবং প্রয়োজনে কার্যকর নৌ-অবরোধ আরোপের মতো অত্যন্ত কঠোর বিধান সংযুক্ত করে নতুন অভিবাসন সংক্রান্ত বিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মন্ত্রিসভা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত এই সামগ্রিক সংস্কার প্যাকেজের সুস্পষ্ট লক্ষ্য মূলত দুটি—একদিকে কঠোর হস্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে ২০২৬ থেকে ২০২৮ মেয়াদের ‘ফ্লো ডিক্রি’র মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা। ফলে মধ্য ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা চালানো বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সামগ্রিক পরিস্থিতি চরম সংকট ও আশঙ্কার মুখে পড়তে যাচ্ছে।

ইতালির নতুন ডিক্রি-আইনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশটিতে বসবাসকারীদের বহিষ্কারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনেক বেশি সহজ ও দ্রুততর করা হবে। সেই সঙ্গে আশ্রয়ের আবেদনের (অ্যাসাইলাম) নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ চার মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যতিক্রমী সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এবং জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার গুরুতর হুমকি দেখা দিলে ইতালির নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় অভিবাসীবাহী যেকোনো জাহাজ বা নৌকা সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত আটকে রাখার এখতিয়ার পাবে। পাশাপাশি দেশের আঞ্চলিক জলসীমায় অননুমোদিত যেকোনো নৌকা প্রবেশের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারির নিরঙ্কুশ ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে সরকারকে।

অবৈধ অভিবাসীদের আটকে রাখা ও বহিষ্কার কার্যক্রম কার্যকর করতে ইতিমধ্যে আলবেনিয়ার সঙ্গে কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পন্ন করে রেখেছে ইতালি। এই চুক্তির আওতায় আলবেনিয়ায় স্থাপিত দুটি বিশেষ ক্যাম্প বর্তমানে প্রত্যাখ্যাতদের ‘রিটার্ন হাব’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার এই বিতর্কিত ইতালীয় মডেলটি এখন পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নই অনুসরণ করার পথে হাঁটছে। গত ১২ জুন কার্যকর হওয়া ইইউর নতুন ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’-এও প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।

ইতালি সরকারের ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে এসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে জানিয়েছে, ইতালি একটি দমনমূলক মডেল অনুসরণ করছে এবং আলবেনিয়ায় আটক রেখে মানুষকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া মৌলিক মানবাধিকারকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। বিলটি বর্তমানে ইতালির পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে; এটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান ঠেকাতে ইতালি কোনো ছাড় দেবে না। লিবিয়া হয়ে সাগরপথে মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার পরিবর্তে সাধারণ মানুষকে বৈধ পথে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে পাড়ি দেওয়াই সফলতার একমাত্র উপায় নয়। তাই প্রতারক দালালদের কথায় প্রলুব্ধ না হয়ে সরকারি নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, কেবল ইতালির ক্ষেত্রে নয়, সব দেশের জন্যই সরকার বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করে; কারণ অবৈধ অনুপ্রবেশ দেশের বৈশ্বিক মর্যাদাকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করে।

বিপজ্জনক সাগরপথের বিপরীতে বৈধ পথে ইতালিতে কর্মী যাওয়ার সুযোগ কিন্তু সম্প্রসারিত হচ্ছে। রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো জানান, বাংলাদেশিদের জন্য সরকারি নির্ধারিত কোটার বাইরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করে ইতালি নেওয়ার একটি নতুন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ইতালি দূতাবাসের তথ্যমতে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সরকারি ‘ডেক্রেতো ফ্লুসি’ কোটায় মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়া হবে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন কর্মী নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অনিয়মিত অভিবাসী প্রত্যাবাসনে সার্বিক সহযোগিতা বজায় রাখার কারণে বাংলাদেশ এই নিয়মিত কোটার সংরক্ষিত সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের তালিকায় রয়েছে। এর বাইরে সবচেয়ে বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর ধারার অধীনে। এই ধারার আওতায় ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ (যার মধ্যে ইতালীয় ভাষা, নাগরিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক কারিগরি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত) দেশে বসেই সম্পন্ন করলে কোটার সীমাবদ্ধতা ছাড়াই সারা বছর যে কেউ বৈধভাবে কর্মসংস্থান নিয়ে ইতালি যেতে পারবেন। এই প্রশিক্ষণের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবেন ইতালীয় নিয়োগকর্তা; ফলে কর্মীকে কোনো দালালকে একটি পয়সাও দিতে হবে না। এমনকি কোনো প্রার্থী দালালকে অর্থ দিয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তাঁর ভিসা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করা হবে।

এদিকে ইতালির সঙ্গে সম্পাদিত অভিবাসন চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে চলমান জল্পনা নাকচ করে দিয়েছেন আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইউরোনিউজ এনলার্জমেন্ট সামিটে তিনি ঘোষণা দেন, রোম যতদিন প্রয়োজন মনে করবে, ততদিনই এই চুক্তি বহাল থাকবে। ২০২৩ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০২৪ সালের মার্চে কার্যকর হওয়া এই পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে মূলত ইইউর নিজস্ব সীমানার বাইরে অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আউটসোর্স করা হচ্ছে। যদিও আলবেনিয়ার শেনজিন ও জাদেরে স্থাপিত কেন্দ্র দুটিতে বর্তমানে শতাধিক ব্যক্তি অবস্থান করছেন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে প্রথম দুই বছরে প্রতিটি ব্যক্তির পেছনে ইতালির ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ইউরো। পূর্বে উদ্ধার হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্র দুটি তৈরির কথা থাকলেও পরবর্তীতে মেলোনি সরকার নীতি পরিবর্তন করে ইতালি থেকে সরাসরি বহিষ্কারযোগ্যদের সেখানে সাময়িক আটকে রাখার কাজে ব্যবহার শুরু করে।

বাস্তবতা হলো, উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশিরাই। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়া থেকে ইতালি ও মাল্টার উদ্দেশে সাগর পাড়ি দেওয়ার মোট ১ লাখ ৭৭৭টি প্রচেষ্টার মধ্যে ২২ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। শুধু ইতালির মাটিতে পৌঁছানো ৬৫ হাজার ৮১ জন অভিবাসীর মধ্যে ৩১ দশমিক ১ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি, যা সব দেশের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ। এরপর অবস্থান ছিল মিশরীয় (১৪%), ইরিত্রীয় (১১.৭%) এবং পাকিস্তানি (৬.৭%) নাগরিকদের। এছাড়া মাল্টায় পৌঁছানো ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। এসব বাংলাদেশির ৯২ শতাংশই পুরুষ এবং মাত্র ৭ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক, যা প্রমাণ করে এই যাত্রা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও শ্রমপ্রত্যাশী অভিবাসন।

তবে এই যাত্রা প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। আইওএমের মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ২০ হাজারের বেশি মানুষের সলিলসমাধি ঘটেছে, যার মধ্যে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথেই মৃত্যু ও নিখোঁজ হয়েছেন ১৭ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে এ পথে ১ হাজার ৭৫৪ জন এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৩৩০ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। আর চলতি বছরে এখন পর্যন্ত এই পথে ১ হাজার ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন বা সাগরে চিরতরে হারিয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে বহুসংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। লিবিয়ায় অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় ও আধুনিক দাসত্বের মতো অবর্ণনীয় নিপীড়ন পেরিয়ে বহু মানুষ নৌকায় উঠলেও দুর্বল ও অতিরিক্ত বোঝাই বোটগুলোর ডুবে যাওয়া এবং ভেসে আসা অজ্ঞাত মরদেহের কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জানান, সারা দেশের মানুষ এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যায় না; মূলত শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী ও কুমিল্লার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে তরুণরা পাচারকারীদের লোভনীয় মিথ্যে আশ্বাসে পা বাড়ায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দালালদের চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের পথ বন্ধ করা এবং লিবিয়াসহ ট্রানজিট দেশগুলোর মানবপাচার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করাই এই প্রাণঘাতী যাত্রা বন্ধের প্রধান উপায়।

Share this news as a Photo Card