মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন
০৮:৫৭ অপরাহ্ন | ৫ই নভেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহঃস্পতিবার, ২০শে কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি

আকাশছোঁয়া খরচ ও চড়া ট্যাক্সের জাঁতাকল: জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা

  • হালনাগাদ সময় : ০৭:৩১:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

কয়েক লাখ টাকার ব্যাংকঋণ এবং পৈতৃক জমি বন্ধক রেখে মাত্র চার মাস আগে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে স্টুডেন্ট ভিসায় জাপানে পাড়ি জমিয়েছিলেন তরুণ মুশফিকুর রহমান। আশা ছিল, পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক দৈন্য দূর করবেন। কিন্তু জাপানের মাটিতে পা রাখার পরপরই সেই রঙিন স্বপ্নের সঙ্গে রুঢ় ও কঠিন বাস্তবতার বিস্তর ফারাক অনুধাবন করতে পারেন তিনি। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই তীব্র টানাপোড়েনে এখন চরম মানসিক হতাশায় দিন কাটছে তাঁর।

রাজধানী টোকিওর একটি রেস্তোরাঁয় পার্টটাইম কাজ করে তিনি যে অর্থ আয় করেন, তার সিংহভাগই চলে যায় ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত ভাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি এবং সরকারের বাধ্যতামূলক নানা ধরনের কর পরিশোধে। মাস শেষে নিজের নূন্যতম খাবারের খরচ জোগাড় করাই যেখানে দুর্বিষহ, সেখানে দেশে টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বাংলাদেশে থাকা পরিবারের অবিরাম প্রত্যাশা—ছেলে জাপানে পাড়ি জমিয়েছে, তাই প্রতি মাসেই মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাবে। স্বজনদের এই অলীক প্রত্যাশার চাপ এবং জাপানের আকাশছোঁয়া খরচের জাঁতাকলে পড়ে তিনি এখন দিশেহারা। টোকিওর একটি মেট্রো স্টেশনে আলাপকালে নিজের এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন এই তরুণ।

মুশফিকুর একা নন, বর্তমানে জাপানে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ঠিক এমনই। চড়া কর, জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবারের প্রত্যাশা, মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সির প্রতারণা এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃক ভিসা বাতিলের শঙ্কা প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকে জর্জরিত করে তুলছে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে পরিবারসহ জাপানে বসবাসকারী প্রবাসী আবুল খায়ের জানান, জাপানে কাজ করে উপার্জনের সুযোগ থাকলেও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বিভিন্ন খাতের ট্যাক্স ও ব্যক্তিগত খরচ মেটানোর পর সঞ্চয় করা প্রায় অসম্ভব। যে পেশাতেই কাজ করা হোক না কেন, সরকারের কর দিতেই হয়; এমনকি ব্যাংক থেকে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়। তবে দেশের পরিবারের সদস্যরা এই কঠিন বাস্তবতা কিছুতেই উপলব্ধি করতে চান না।

টোকিওর ব্যস্ততম এলাকা শিনওকোবোতে সরেজমিনে দেখা মেলে প্রবাসীদের এমন টানাপোড়েনের চিত্র। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এই এলাকায় মেট্রো স্টেশনের কাছেই ঢাকার ফকিরাপুল এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়ার ছোট্ট একটি চায়ের দোকান রয়েছে। প্রায় দেড় দশক ধরে জাপানে থাকা সুমনের মাত্র কয়েক বর্গফুটের এই দোকানটির পেছনেই প্রতি মাসে ভাড়া গুনতে হয় প্রায় ৩ লাখ জাপানি ইয়েন। সেখানে চায়ের কাপে আড্ডা জমলেও শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে খেলা করে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা। এই দোকানে সামান্য একটি সিঙ্গারা ও একটি পেঁয়াজু খেতেই গুনতে হয় ৪০০ ইয়েন (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫০ টাকা)। পাশের গলির এক রেস্তোরাঁয় এক বাটি পাতলা ডালের দামও একই। আর দেশীয় স্বাদে সামান্য ডাল-ভর্তা দিয়ে একবেলা ভাত খেতে খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ইয়েন, যা দেশীয় টাকায় প্রায় ৯০০ টাকার সমান। প্রবাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের এই লাগামহীন দামই প্রমাণ করে সেখানে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর টিকে থাকা কতটা সংগ্রামের।

এই সংকটের মূলে রয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর দালাল ও প্রতারক এজেন্সির চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদ। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পরিবারের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা জাপানে গেলেও সেখানে গিয়ে পড়েন বিপাকে। টোকিওর ওহানাজায়াতে আইটি বিষয়ে অধ্যয়নরত কুমিল্লার তরুণ মোহাম্মদ সাকিব হাসান জানান, বাংলাদেশে মাত্র ৬০ হাজার টাকা ও সাত মাস সময়ে জাপানি ভাষার ‘এন-৩’ (N3) কোর্স সম্পন্ন করা সম্ভব। অথচ এজেন্সিগুলোর প্ররোচনায় পড়ে জাপানের ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে এসে একই কোর্স করতে একেকজন শিক্ষার্থীর অপচয় হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকা। একে তিনি ‘দ্য গ্রেট জাপানিজ স্ক্যাম’ বা জাপানি শিক্ষার পাতা ফাঁদ বলে আখ্যা দেন। জাপানে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশির অর্ধেকই শিক্ষার্থী, যাদের একটি বড় অংশ ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত।

জাপানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর আইনি সীমারেখা। শিক্ষার্থী ভিসায় আয়ের জন্য প্রথমে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় এবং একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা খণ্ডকালীন কাজ করার সুযোগ পান। বড় শহরগুলোতে ঘণ্টায় সর্বনিম্ন ১২৭০ ইয়েন মজুরি ধরলে সর্বোচ্চ পরিশ্রমের পর মাসে বৈধভাবে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ইয়েন আয় করা সম্ভব।

তবে এই আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের তালিকা দীর্ঘ। কোনো মতে শেয়ারিং ফ্ল্যাটে এক কক্ষে পাঁচজন গাদাগাদি করে থাকলেও বাসাভাড়া বাবদ গুনতে হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার ইয়েন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট বিল বাবদ ব্যয় হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার ইয়েন। নিজে রেঁধে খেলে খাবারের পেছনে যায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার ইয়েন (বাইরে খেলে যা তিন গুণ পর্যন্ত হতে পারে)। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয়; যেখানে বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১৯০ ইয়েন এবং ট্রেনে ২০০ ইয়েন।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে কর কর্তনে। বেতন হাতে পাওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক বীমা (স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশন) এবং আয়কর বাবদ অর্থ কেটে নেওয়া হয়। আর দ্বিতীয় বছর থেকে যোগ হয় আগের বছরের আয়ের ওপর ধার্যকৃত প্রায় ১০ শতাংশ ‘রেসিডেন্স ট্যাক্স’। ফলে আইনি সীমার মধ্যে কাজ করে নিজের ভরণপোষণ ও টিউশন ফি পরিশোধের পর দেশে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, নিজের চলাই কঠিন হয়ে পড়ে।

অবশ্য এই কর ও বীমা ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। জাপানের চিবা এলাকার বাসিন্দা মৌসুমী ইসলাম জানান, করের সুবিধা হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত সাশ্রয়ী হয়। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর হাসপাতালে প্রায় ৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ খরচের মধ্যে বীমার কল্যাণে মাত্র ২ লাখ ইয়েন পরিশোধ করতে হয়েছিল; এমনকি স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার সময় পেনশনের অর্থও পুরোপুরি ফেরত দেওয়া হয়। ২০০৮ সাল থেকে জাপানে থাকা মাইনুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, জাপানে সবার জন্যই আইন সমান। বড় ব্যবসা বা উচ্চ বেতনের চাকরি ছাড়া সাধারণ কাজে মাস শেষে টাকা জমানো যায় না। কিন্তু দেশের পরিবার এই বাস্তবতা না বুঝে বাড়তি টাকার দাবি জানাতে থাকায় প্রবাসীরা মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলছেন।

এদিকে কাজের ক্যাটাগরি ও অভিবাসন নীতিতে জাপান সরকার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। হিরোশিমা ইউনিভার্সিটির গবেষক ডা. জিয়াউর রহমান জানান, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতারণা না করলেও ইমিগ্রেশন এখন নিয়ম মানার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কাউন্সিলর জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কাজের সময় তদারকিতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদের কাজের সময় ও স্থানের বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে হবে।

সপ্তাহে নির্ধারিত ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভিসা নবায়ন না করে মাত্র দুই সপ্তাহের নোটিশে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া যে বিষয়ে পড়াশোনা বা ডিপ্লোমা করা হয়েছে, তার বাইরে অন্য কোনো খাতে (যেমন মেকানিক্যালের শিক্ষার্থী হয়ে কৃষিকাজে) যুক্ত হলে ভিসা মিলছে না। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মাসে দুই-তিন লাখ টাকা আয়ের চটকদার বিজ্ঞাপনে কান দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করলে ক্লাসে উপস্থিতি কমে যায় এবং ভিসা হারিয়ে অবশেষে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়। তাই জাপানে আসার আগেই সব বাস্তবতা সঠিকভাবে জেনে আসা অত্যন্ত জরুরি।

Share this news as a Photo Card

জনপ্রিয় সংবাদ

আকাশছোঁয়া খরচ ও চড়া ট্যাক্সের জাঁতাকল: জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা

05 November 2026

প্রথমবারের মতো কুবিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় স্নাতক গণিত অলিম্পিয়াড

www.deshkhobor24.com |
fb/deshkhobor24bd

আকাশছোঁয়া খরচ ও চড়া ট্যাক্সের জাঁতাকল: জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নভঙ্গের বাস্তবতা

হালনাগাদ সময় : ০৭:৩১:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

কয়েক লাখ টাকার ব্যাংকঋণ এবং পৈতৃক জমি বন্ধক রেখে মাত্র চার মাস আগে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে স্টুডেন্ট ভিসায় জাপানে পাড়ি জমিয়েছিলেন তরুণ মুশফিকুর রহমান। আশা ছিল, পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক দৈন্য দূর করবেন। কিন্তু জাপানের মাটিতে পা রাখার পরপরই সেই রঙিন স্বপ্নের সঙ্গে রুঢ় ও কঠিন বাস্তবতার বিস্তর ফারাক অনুধাবন করতে পারেন তিনি। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই তীব্র টানাপোড়েনে এখন চরম মানসিক হতাশায় দিন কাটছে তাঁর।

রাজধানী টোকিওর একটি রেস্তোরাঁয় পার্টটাইম কাজ করে তিনি যে অর্থ আয় করেন, তার সিংহভাগই চলে যায় ফ্ল্যাটের অতিরিক্ত ভাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি এবং সরকারের বাধ্যতামূলক নানা ধরনের কর পরিশোধে। মাস শেষে নিজের নূন্যতম খাবারের খরচ জোগাড় করাই যেখানে দুর্বিষহ, সেখানে দেশে টাকা পাঠানো সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বাংলাদেশে থাকা পরিবারের অবিরাম প্রত্যাশা—ছেলে জাপানে পাড়ি জমিয়েছে, তাই প্রতি মাসেই মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাবে। স্বজনদের এই অলীক প্রত্যাশার চাপ এবং জাপানের আকাশছোঁয়া খরচের জাঁতাকলে পড়ে তিনি এখন দিশেহারা। টোকিওর একটি মেট্রো স্টেশনে আলাপকালে নিজের এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন এই তরুণ।

মুশফিকুর একা নন, বর্তমানে জাপানে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রাত্যহিক জীবনের চিত্র ঠিক এমনই। চড়া কর, জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবারের প্রত্যাশা, মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সির প্রতারণা এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃক ভিসা বাতিলের শঙ্কা প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকে জর্জরিত করে তুলছে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে পরিবারসহ জাপানে বসবাসকারী প্রবাসী আবুল খায়ের জানান, জাপানে কাজ করে উপার্জনের সুযোগ থাকলেও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বিভিন্ন খাতের ট্যাক্স ও ব্যক্তিগত খরচ মেটানোর পর সঞ্চয় করা প্রায় অসম্ভব। যে পেশাতেই কাজ করা হোক না কেন, সরকারের কর দিতেই হয়; এমনকি ব্যাংক থেকে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়। তবে দেশের পরিবারের সদস্যরা এই কঠিন বাস্তবতা কিছুতেই উপলব্ধি করতে চান না।

টোকিওর ব্যস্ততম এলাকা শিনওকোবোতে সরেজমিনে দেখা মেলে প্রবাসীদের এমন টানাপোড়েনের চিত্র। বাংলাদেশি অধ্যুষিত এই এলাকায় মেট্রো স্টেশনের কাছেই ঢাকার ফকিরাপুল এলাকার বাসিন্দা সুমন মিয়ার ছোট্ট একটি চায়ের দোকান রয়েছে। প্রায় দেড় দশক ধরে জাপানে থাকা সুমনের মাত্র কয়েক বর্গফুটের এই দোকানটির পেছনেই প্রতি মাসে ভাড়া গুনতে হয় প্রায় ৩ লাখ জাপানি ইয়েন। সেখানে চায়ের কাপে আড্ডা জমলেও শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে খেলা করে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা। এই দোকানে সামান্য একটি সিঙ্গারা ও একটি পেঁয়াজু খেতেই গুনতে হয় ৪০০ ইয়েন (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫০ টাকা)। পাশের গলির এক রেস্তোরাঁয় এক বাটি পাতলা ডালের দামও একই। আর দেশীয় স্বাদে সামান্য ডাল-ভর্তা দিয়ে একবেলা ভাত খেতে খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ইয়েন, যা দেশীয় টাকায় প্রায় ৯০০ টাকার সমান। প্রবাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের এই লাগামহীন দামই প্রমাণ করে সেখানে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর টিকে থাকা কতটা সংগ্রামের।

এই সংকটের মূলে রয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর দালাল ও প্রতারক এজেন্সির চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদ। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে পরিবারের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা জাপানে গেলেও সেখানে গিয়ে পড়েন বিপাকে। টোকিওর ওহানাজায়াতে আইটি বিষয়ে অধ্যয়নরত কুমিল্লার তরুণ মোহাম্মদ সাকিব হাসান জানান, বাংলাদেশে মাত্র ৬০ হাজার টাকা ও সাত মাস সময়ে জাপানি ভাষার ‘এন-৩’ (N3) কোর্স সম্পন্ন করা সম্ভব। অথচ এজেন্সিগুলোর প্ররোচনায় পড়ে জাপানের ল্যাঙ্গুয়েজ স্কুলে এসে একই কোর্স করতে একেকজন শিক্ষার্থীর অপচয় হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকা। একে তিনি ‘দ্য গ্রেট জাপানিজ স্ক্যাম’ বা জাপানি শিক্ষার পাতা ফাঁদ বলে আখ্যা দেন। জাপানে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশির অর্ধেকই শিক্ষার্থী, যাদের একটি বড় অংশ ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত।

জাপানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর আইনি সীমারেখা। শিক্ষার্থী ভিসায় আয়ের জন্য প্রথমে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় এবং একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা খণ্ডকালীন কাজ করার সুযোগ পান। বড় শহরগুলোতে ঘণ্টায় সর্বনিম্ন ১২৭০ ইয়েন মজুরি ধরলে সর্বোচ্চ পরিশ্রমের পর মাসে বৈধভাবে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ইয়েন আয় করা সম্ভব।

তবে এই আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের তালিকা দীর্ঘ। কোনো মতে শেয়ারিং ফ্ল্যাটে এক কক্ষে পাঁচজন গাদাগাদি করে থাকলেও বাসাভাড়া বাবদ গুনতে হয় ৩০ থেকে ৫০ হাজার ইয়েন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট বিল বাবদ ব্যয় হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার ইয়েন। নিজে রেঁধে খেলে খাবারের পেছনে যায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার ইয়েন (বাইরে খেলে যা তিন গুণ পর্যন্ত হতে পারে)। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন ব্যয়; যেখানে বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১৯০ ইয়েন এবং ট্রেনে ২০০ ইয়েন।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে কর কর্তনে। বেতন হাতে পাওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক বীমা (স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশন) এবং আয়কর বাবদ অর্থ কেটে নেওয়া হয়। আর দ্বিতীয় বছর থেকে যোগ হয় আগের বছরের আয়ের ওপর ধার্যকৃত প্রায় ১০ শতাংশ ‘রেসিডেন্স ট্যাক্স’। ফলে আইনি সীমার মধ্যে কাজ করে নিজের ভরণপোষণ ও টিউশন ফি পরিশোধের পর দেশে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, নিজের চলাই কঠিন হয়ে পড়ে।

অবশ্য এই কর ও বীমা ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। জাপানের চিবা এলাকার বাসিন্দা মৌসুমী ইসলাম জানান, করের সুবিধা হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত সাশ্রয়ী হয়। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর হাসপাতালে প্রায় ৯ লাখ টাকার সমপরিমাণ খরচের মধ্যে বীমার কল্যাণে মাত্র ২ লাখ ইয়েন পরিশোধ করতে হয়েছিল; এমনকি স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে যাওয়ার সময় পেনশনের অর্থও পুরোপুরি ফেরত দেওয়া হয়। ২০০৮ সাল থেকে জাপানে থাকা মাইনুল ইসলাম আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, জাপানে সবার জন্যই আইন সমান। বড় ব্যবসা বা উচ্চ বেতনের চাকরি ছাড়া সাধারণ কাজে মাস শেষে টাকা জমানো যায় না। কিন্তু দেশের পরিবার এই বাস্তবতা না বুঝে বাড়তি টাকার দাবি জানাতে থাকায় প্রবাসীরা মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলছেন।

এদিকে কাজের ক্যাটাগরি ও অভিবাসন নীতিতে জাপান সরকার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর। হিরোশিমা ইউনিভার্সিটির গবেষক ডা. জিয়াউর রহমান জানান, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতারণা না করলেও ইমিগ্রেশন এখন নিয়ম মানার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কাউন্সিলর জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কাজের সময় তদারকিতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদের কাজের সময় ও স্থানের বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে হবে।

সপ্তাহে নির্ধারিত ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভিসা নবায়ন না করে মাত্র দুই সপ্তাহের নোটিশে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া যে বিষয়ে পড়াশোনা বা ডিপ্লোমা করা হয়েছে, তার বাইরে অন্য কোনো খাতে (যেমন মেকানিক্যালের শিক্ষার্থী হয়ে কৃষিকাজে) যুক্ত হলে ভিসা মিলছে না। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মাসে দুই-তিন লাখ টাকা আয়ের চটকদার বিজ্ঞাপনে কান দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করলে ক্লাসে উপস্থিতি কমে যায় এবং ভিসা হারিয়ে অবশেষে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়। তাই জাপানে আসার আগেই সব বাস্তবতা সঠিকভাবে জেনে আসা অত্যন্ত জরুরি।

Share this news as a Photo Card