মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত শুনানি আজ সোমবার থেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) শুরু হচ্ছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা এই বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে অত্যন্ত আগ্রহ ও প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অন্তত ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। তারা আশা করছেন, এই বিচারের মাধ্যমেই নিজ জন্মভূমিতে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে ফিরে যাওয়ার আইনি পথ প্রশস্ত হবে।
২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ ও পরিকল্পিত গণহত্যার বিচার চেয়ে ২০১৯ সালে আইসিজে-তে এই মামলাটি দায়ের করে গাম্বিয়া। ১২ জানুয়ারি থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত এই শুনানির মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণ বাড়বে এবং থমকে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এই শুনানিকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা রোহিঙ্গা তরুণ ও প্রবীণরা জানান, তাদের স্বজনদের হত্যা ও জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়ার অগণিত ভিডিও এবং নথি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ভুক্তভোগী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। তাদের অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি রক্ষা এবং বিদেশি অনুদান প্রাপ্তির একটি ‘প্রকল্প’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ফলে গাম্বিয়াকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে কার্যকর সহযোগিতা করা হয়নি, যা বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করেছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করা গবেষক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ছালেহ শাহরিয়ারের মতে, বিগত সরকার সংকটের প্রকৃত সমাধান চায়নি বলেই বাংলাদেশ সরাসরি এই মামলার পক্ষভুক্ত হয়নি। তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেরও এই ইস্যুতে যতটা সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন ছিল, তার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পুরো বিচার প্রক্রিয়ার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। গাম্বিয়া ইতিমধ্যে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণাদি আদালতে উপস্থাপন করতে পেরেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
তবে এই বিচার প্রক্রিয়া থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরাতে এবং আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করতে মিয়ানমার ফের সীমান্তে উত্তেজনার কূটকৌশল শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে মিয়ানমার বাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং ওপারে চলমান জান্তা ও বিদ্রোহী সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাবেক কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম সতর্ক করে বলেছেন, আইসিজের এই চূড়ান্ত শুনানিকে আড়াল করতেই সীমান্তে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তে বিজিবির জনবল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি আইসিজের রায় রোহিঙ্গাদের অনুকূলে আসে, তবে মিয়ানমার নৈতিকভাবে বিশ্ব দরবারে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এর ফলে চীন ও ভারতের মতো বড় শক্তিগুলোর ওপর মিয়ানমার ইস্যুতে অবস্থান পরিবর্তনের চাপ তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
রিপোর্টারের নাম 






















