ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরও জোরালো রূপ নেওয়ায় তা দমনে কঠোর ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। গত কয়েক বছরের মধ্যে সবথেকে বড় এই গণবিক্ষোভের পেছনে ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করে ইসলামি শাসনব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুতই রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা বর্তমানে দেশটিতে ধর্মীয় শাসনের অবসান দাবি করছেন।
শনিবার রাত নামার পর রাজধানী তেহরানসহ উত্তরের রাশত, উত্তর–পশ্চিমে তাবরিজ এবং দক্ষিণের সিরাজ ও কেরমান শহরে নতুন করে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের সাদাতাবাদ এলাকায় বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ এবং ‘খামেনি নিপাত যাক’।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে পরিস্থিতির ভয়াবহতা পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়লেও বিভিন্ন স্থান থেকে সহিংসতার খবর আসছে। তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি সরকারি ভবনে আগুন দেওয়ার খবর জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে নিহত নিরাপত্তা কর্মীদের জানাজার দৃশ্যও সম্প্রচার করা হয়েছে।
বিক্ষোভের মুখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরান এখন মুক্তির প্রতীক্ষায়, যা সম্ভবত আগে কখনও দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের জন্য প্রস্তুত আছে!’ ট্রাম্প গত শুক্রবার ইরানের নেতাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আপনারা গুলি চালানো শুরু করবেন না, কারণ আমরাও তখন গুলি চালানো শুরু করবো।’
এদিকে, ইরানের নির্বাসিত শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভি এক ভিডিও বার্তায় এই বিক্ষোভকে গণ–অভ্যুত্থানে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ৬৫ বছর বয়সী পাহলভি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন আর শুধু রাস্তায় নামা নয়; লক্ষ্য হলো শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করা এবং তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা।’ তিনি দ্রুতই ইরানে ফেরার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
ইরানি মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ–এর তথ্যমতে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ জনকে। তেহরানের কাছে বাহারিস্তান এলাকা থেকে অন্তত ১০০ জন ‘সশস্ত্র দাঙ্গাকারীকে’ গ্রেফতারের দাবি করেছে তাসনিম নিউজ এজেন্সি।
উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, হাসপাতালে প্রচুর আহত বিক্ষোভকারী আসছেন। তাদের অনেকের শরীরে গুলির ক্ষত এবং গুরুতর জখম রয়েছে। একটি হাসপাতালেই অন্তত ২০ জন সরাসরি গুলিতে আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫ জন মারা গেছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইসলামি বিপ্লবের অর্জন এবং নিরাপত্তা রক্ষা করা তাদের কাছে ‘রেড লাইন’। এই সীমা অতিক্রম করলে তারা কঠোর হবে। অন্যদিকে নিয়মিত সামরিক বাহিনীও কৌশলগত অবকাঠামো ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ঘোষণা দিয়েছে।
বিক্ষোভের এই পরিস্থিতিকে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা একটি ‘ধৈর্যের খেলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, বিরোধী পক্ষ চাইছে সরকারের প্রভাবশালীরা পালানো বা পক্ষ ত্যাগ না করা পর্যন্ত চাপ বজায় রাখতে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ চাচ্ছে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে রাস্তা ফাঁকা করতে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপের কোনও অজুহাত না পায়।
বিক্ষোভে কিছু মানুষ পাহলভির পক্ষে ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোন’ স্লোগান দিলেও বেশির ভাগ স্লোগানই ধর্মীয় শাসনের অবসান ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হয়ে কাজ করার অভিযোগ এনেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিদেশি ভাড়াটে হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের তেহরান মোটেও সহ্য করবে না।
রিপোর্টারের নাম 






















