ঢাকা ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বিনিয়োগে ধসের মুখে দেশ: গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি বর্তমানে ইতিহাসের চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তোলে। এছাড়া বেসরকারি ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) গ্রাফও এখন তলানিতে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকিং খাতের টেকসই উন্নয়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সংস্কার কর্মকাণ্ড নির্বাচিত সরকারকেও অব্যাহত রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে এর কোনো প্রতিফলন নেই; উল্টো দাম বেড়েছে। দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কেন দাম কমছে না, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা ফেলো ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

আলোচনায় উঠে আসে যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫’ এর মতো ব্যয়বহুল আয়োজন করেছিল। প্রায় ৫০টি দেশের প্রতিনিধি ও বিনিয়োগকারীরা সেখানে অংশ নিয়ে ৩২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো গত দেড় বছরে অর্থনীতির অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বিভিন্ন দেশ সফর এবং বিনিয়োগের আশ্বাস সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মূলধন প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। ঋণের এই ক্রমবর্ধমান বোঝা বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে ড. ফাহমিদা খাতুন পরামর্শ দেন যে, আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত বা বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজার সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ, মাছ ও মাংসের বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সিপিডির পক্ষ থেকে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রাজস্ব আদায়ের নতুন উৎস সন্ধান, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বাতিল, অর্থপাচার রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। এছাড়া প্রকল্প ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির প্রধান শক্তি। বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক নীতি সাজাতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং জ্বালানি খাতের সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে সামষ্টিক অর্থনীতির গতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসবে বলে সিপিডি আশা প্রকাশ করে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

বিনিয়োগে ধসের মুখে দেশ: গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন

আপডেট সময় : ১১:২৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি বর্তমানে ইতিহাসের চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তোলে। এছাড়া বেসরকারি ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) গ্রাফও এখন তলানিতে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকিং খাতের টেকসই উন্নয়নে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সংস্কার কর্মকাণ্ড নির্বাচিত সরকারকেও অব্যাহত রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে এর কোনো প্রতিফলন নেই; উল্টো দাম বেড়েছে। দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কেন দাম কমছে না, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা ফেলো ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

আলোচনায় উঠে আসে যে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট-২০২৫’ এর মতো ব্যয়বহুল আয়োজন করেছিল। প্রায় ৫০টি দেশের প্রতিনিধি ও বিনিয়োগকারীরা সেখানে অংশ নিয়ে ৩২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো গত দেড় বছরে অর্থনীতির অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বিভিন্ন দেশ সফর এবং বিনিয়োগের আশ্বাস সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মূলধন প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। ঋণের এই ক্রমবর্ধমান বোঝা বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।

ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে ড. ফাহমিদা খাতুন পরামর্শ দেন যে, আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনে দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত বা বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজার সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। বিশেষ করে আলু, পেঁয়াজ, মাছ ও মাংসের বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সিপিডির পক্ষ থেকে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রাজস্ব আদায়ের নতুন উৎস সন্ধান, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বাতিল, অর্থপাচার রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। এছাড়া প্রকল্প ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

পরিশেষে ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীই অর্থনীতির প্রধান শক্তি। বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক নীতি সাজাতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং জ্বালানি খাতের সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে সামষ্টিক অর্থনীতির গতিশীলতা পুনরায় ফিরে আসবে বলে সিপিডি আশা প্রকাশ করে।