কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে সারা পৃথিবীতেই রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের গড়পড়তা ধারণা নেতিবাচক। মানুষ মনে করে, রাজনীতিবিদরা যা বলেন, তার বড় অংশই মিথ্যা, চাপাবাজি, কথার ফুলঝুরি, প্রতিশ্রুতির বেলুন। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভোট পাওয়ার জন্য তারা যা বলেন, যেসব প্রতিশ্রুতি দেন, ভোটে জয়ের পরে তার অধিকাংশই ভুলে যান। আবার তারা নিজেদের উপার্জন সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রকাশ করেন, সেখানেও থাকে নানা ফাঁকিবাজি এবং অবিশ্বাস্য সব অংক। বিশেষ করে নির্বাচনি হলফনামায় তারা যেসব তথ্য দেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়। ফলে সত্য তথ্যও অনেক সময় মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামায় যেসব তথ্য দিয়েছেন, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বিশেষ করে হাইপ্রোফাইল বা হেভিওয়েট প্রার্থীদের হলফনামা বা আমলনামা নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্টের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায়ও নানারকম রসিকতা চলছে।
এ বছর জমা দেওয়া হলফনামায় দেখা গেছে, বড় পাঁচটি দলের ১০ শীর্ষ নেতার মধ্যে সাতজনেরই মাসে আয় লাখ টাকার কম। হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে কম আয় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের। তার বার্ষিক আয় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। মানে মাসে মাত্র ৩০ হাজার টাকা! প্রশ্ন হলো, এই টাকা দিয়ে তিনি কীভাবে চলেন? যেখানে বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যম সারির নেতারাও কোটি টাকা দামের গাড়িতে চড়েন, বিলাশবহুল বাড়িতে থাকেন, দলীয় অনুষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা অনুদান দেন, সামাজিক নানা কর্মকাণ্ড এবং দান-খয়রাতের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করেন, তাদের মাসিক আয় এক লাখ টাকা বা তারও কম—এই তথ্য কতজন লোক বিশ্বাস করে? এরকম অবিশ্বাস্য অংক দিয়ে তারা কেন জনগণের কাছে হাস্যরসের পাত্র হচ্ছেন, এটি যেমন একটি প্রশ্ন, তেমনি বার্ষিক উপার্জনের যে তথ্য তারা হলফনামায় দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন কি তার সত্যতা খতিয়ে দেখে? দুর্নীতি দমন কমিশনের এখানে কি কোনও ভূমিকা নেই?
তারা যে বার্ষিক আয়ের অংকটা হলফনামায় উল্লেখ করেন, সেটি হয়তো তাদের বৈধ আয়। কিন্তু অবৈধ আয়ের কথা উল্লেখ করা যেহেতু আইনসিদ্ধ নয়, ফলে তারা এটি গোপন করেন। তবে এটা ঠিক যে, অনেক প্রার্থী হয়তো তাদের প্রকৃত আয়ের কথাই হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেই সংখ্যাটি খুব বেশি নয়।
বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘হলফ’ হলফ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে, সত্য বলার জন্য যে শপথ করা হয়। তার মানে হলফনামা শব্দের অর্থ সত্যনামা। অর্থাৎ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের সম্পর্কে যে শপথ করে সত্য তথ্য প্রকাশ করেন সেটিই হলফনামা। কিন্তু রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে গড়পড়তা ধারণা, তাতে নির্বাচনি হলফনামায় তারা যে তথ্য দেন, সেখানে তারা কত শতাংশ সত্য বলেন আর কত শতাংশ সত্য গোপন করেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যাবলির সমন্বয়ে একটি করে হলফনামা জমা দেওয়ার বিধান চালু হয়। এর জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনী আনা হয়। সংশোধিত আইন মোতাবেক গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর ১২(৩বি) অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামার মাধ্যমে ১০টি তথ্য এবং কোনও কোনও তথ্যের সপক্ষে কাগজপত্র দাখিল করতে হয়।
আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্রের সাথে হলফনামার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাবলী ভোটারদের মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন, এ বছর মনোনয়নপত্র দাখিলের পরেই এগুলো নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেকোনো নাগরিক চাইলে সাইটে গিয়ে যেকোনও প্রার্থীর হলফনামা দেখতে পারেন।
হলফনামায় প্রার্থীদের ১০টি তথ্য দিতে হয়। এগুলো হচ্ছে: ১. নাম ও বিস্তারিত পরিচয়
২. শিক্ষাগত যোগ্যতা
৩. মামলার বিবরণ (যদি থাকে)
৪. পেশা
৫. নির্ভরশীলদের পেশার তালিকা
৬. আয়ের উৎস
৭. সম্পত্তি ও দায়ের বিবরণী
৮. প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস (আগে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকলে তার বিবরণ)
৯. ঋণ সংক্রান্ত তথ্য
১০. আয়কর সংক্রান্ত তথ্য
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী হলফনামায় ভুল দিলে, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান না করলে অথবা দাখিলকৃত হলফনামায় কোনও অসত্য তথ্য প্রদান দিলে বা হলফনামায় উল্লিখিত কোনও তথ্যের সমর্থনে যথাযথ সার্টিফিকেট, দলিল, ইত্যাদি দাখিল না করলে বা আদেশের বিধানাবলী যথাযথভাবে প্রতিপালন না করলে রিটার্নিং অফিসার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিতে পারবেন। এমনকি হলফনামায় প্রদত্ত কোনও তথ্য মিথ্যা বা ভুল বলে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। (জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েল, ২০০৮ পৃ. ৩৯)।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশের ৩০০টি আসনে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এবার মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ জন সম্ভাব্য প্রার্থী। অর্থাৎ যাচাই-বাছাই শেষে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে তিনটি আসনে জমা দেওয়া তার মনোনয়নপত্রগুলো সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
বিরাট সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে মূলত হলফনামায় ভুল, অসত্য, অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া এবং তথ্য গোপনের কারণে। যদিও ৯ জানুয়ারি বিকাল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আপিল করতে পারবেন। সেখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারলে অনেকে হয়তো মনোনয়ন ফিরেও পাবেন।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা দেওয়ার এই বিধানটি নির্বাচনি আইনে যুক্ত হয় মূলত একটি বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ২০০৫ সালের ২৪ মে হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেন। আবদুল মোমেন চৌধুরী ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ নামে পরিচিত একটি মামলার শুনানি শেষে আদালত রায়ে বলেন, ভোটারদের তথ্য জানার অধিকার সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার’ একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেহেতু ভোট দেওয়া একজন নাগরিকের মত প্রকাশের মাধ্যম, তাই ভোটারদের জানার অধিকার আছে যে তিনি কাকে ভোট দিচ্ছেন এবং প্রার্থীর অতীত ইতিহাস কী।
২০০৫ সালে হাইকোর্ট এই নির্দেশনা দিলেও তৎকালীন নির্বাচন কমিশন তা কার্যকর করতে গড়িমসি করে। পরবর্তীতে ২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বধানী নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, জনগণ যাদেরকে ভোট দিচ্ছে, তাদের ব্যাপারে আগেই সম্যক ধারণা লাভ। শুধুমাত্র ব্যক্তির পরিচয়, পারিবারিক ঐতিহ্য কিংবা দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর করে যাতে ভোটাররা কাউকে ভোট না দেন, বরং ভোট দেওয়ার আগে যাতে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, জীবনাচরণ, উপার্জনের স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে পারে, সেজন্য হলফনামার এই বিধান করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১০টি তথ্যের মধ্যে আয়ের উৎস এবং বার্ষিক আয় সম্পর্কে অধিকাংশ প্রার্থীই যে সত্য তথ্য দেন না বা তথ্য গোপন করেন—এটি এখন ওপেন সিক্রেট। এমনকি খ্যাতিমান রাজনীতিবিদরাও নিজেদের বার্ষিক আয়ের যে হিসাব হলফনামায় উল্লেখ করেন, তা অনেক সময়ই বিশ্বাসযোগ্য হয় না। বরং জনপরিসরে তা নিয়ে রসিকতা হয়। ফলে যে উদ্দেশ্যে হলফনামার বিধান করা হলো, তা অনেকখানি অপূর্ণ থেকে যায়।
তবে এর একটি ভালো দিক হলো, যেহেতু হলফনামার সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়, ফলে তাদের প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা মানুষ জেনে যায়। অনেককেই টেলিভিশনের টকশোতে দেখে বা রাজনীতির মঞ্চে জ্বালামীয় ভাষণ শুনে অনেককে উচ্চশিক্ষিত মনে হলেও হলফনামায় দেওয়া তথ্যে দেখা যায় তারা আসলে উচ্চমাধ্যমিক পাস।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে সংসদ সদস্য বা আইনপ্রণেতা হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রিধারী না হলে তিনি এমপি হতে পারবেন না, এমন বিধান না থাকার ফলে মাধ্যমিক পাস না করেও অনেকে এমপি মন্ত্রী হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখের কারণে ভোটাররা সহজেই জানতে পারছেন, তিনি যাকে ভোট দিচ্ছেন তিনি কী পাস। যিনি সংসদে গিয়ে আইন প্রণয়ণ করবেন, দেশের জন্য নীতি ও পরিকল্পনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, সেই মানুষটির পড়ালেখার দৌড় কতটুকু—সেটি জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে মূলত এই হলফনামার কারণেই। গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে হলফনামার গুরুত্ব কম নয়।
এর মধ্য দিয়ে ভোটাররা তাদের প্রার্থীদের যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা বিচার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আবার হলফনামায় ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে মনোনয়নপত্র বাতিল, এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পর সদস্যপদ বাতিলেরও যেহেতু আইনি বিধান রয়েছে, ফলে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য যা খুশি তা-ই করার সুযোগও বন্ধ হয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক
রিপোর্টারের নাম 
























