ঢাকা ০২:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ও খালেদা জিয়ার প্রয়াণের বছরকে বিদায়

প্রিয় তুনাবী,

এই প্রথম জানতে চাইবো না কেমন আছো তুমি?

আমি ভালো নেই তুনাবী। তুমি জানো যে বাংলাদেশের একান্ত স্বজন নিঃসঙ্গ শেরপা’র মতো এক নিঃসঙ্গ সারথি বিদায় নিয়েছেন ৩০ ডিসেম্বর। তিনি প্রথম নিঃসঙ্গ হন ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে তার স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান, তাকে ও তাঁর দুই সন্তানকে ‘অকূল পাথারে’ ফেলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘যুদ্ধে’ গিয়েছিলেন। দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি সীমাহীন বিপদে পড়েছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৬। নিয়তি এই যে, দশ বছর পরে ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। নিঃসঙ্গতার শাড়ি চিরস্থায়ী হয়ে যায় তখন। রাজনৈতিক বাস্তবতা ২০১০ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি এবং খুব সাধারণ মানুষের কান্না শতাব্দীর দেয়ালে তাঁর নাম খোদাই করে লিখে রেখেছে। কেউ কী দেখেছে জানাযা এমন?

তুনাবী এবার বলো অভিবাসীদের প্রতি আগাগোড়া নির্মম ডোনাল্ড  ট্রাম্পের দেশে কেমন কাটছে তোমার? হয়তো তোমার পাসপোর্ট আছে, তোমার ভয় নেই। কিন্তু আমি ভালো নেই, নিদারুন ভয়ে আছি! মনে হচ্ছে কোনও এক নিঃশব্দ আততায়ী খুব কাছে এসে আমাকে বুলেট ভালোবাসায় বিদ্ধ করে চলে যাবে। নিথর আমার ঠাঁই হবে প্রথম মেডিক্যালের কোনও এক বিছানায়, তারপর আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম করুনা করে নিয়ে যাবে আমাকে কোনও নামহীন গোত্রহীন কবরে!

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী যেভাবে নিহত হয়েছেন, তার খুনিদের যেমন করে সযতনে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, আমার আততায়ীও তেমন করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে দেশে অথবা বিদেশে।

তুনাবী, আমার প্রেমকে খুন করে যেমন করে তুমি ঘুরে বেড়াচ্ছ আমেরিকায়।

তুনাবী, এনসিপির মতো হতে পারিনি বলে আমি ভালো নেই। তোমাকে হারিয়ে আমি জীবনভর অপেক্ষা করে আছি। আর পারতাম দেবদাসের মতো নিজেকে শেষ করে ফেলতে। তবু যৌতুক নিয়ে বিয়ে কিংবা অন্য কারো প্রেমে বিলীন হতে পারতাম না। বাচ্চাদের দল খ্যাত এনসিপি তাই-ই করেছে। নির্বাচনি যৌতুকের নিশ্চয়তা পেতে তারা জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনি জোট বেঁধেছে।

স্বৈরাচারের পতনের সময় জুলাই জাগরণে তোলা আকাশছোঁয়া স্লোগান- ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’কেই সত্য ভাবছেন অনেকে। ভাবছেন যারা সৃষ্টি করেছিল এনসিপিকে, এনসিপি তাদের ছাতির নিচেই আশ্রয় নিয়েছে। এই ছাতার কারণে জামায়াতেই বিলীন হবে এনসিপি। আরও একজন আছেন যার নাম কর্নেল অলি আহমেদ, বীরক্রিম। যিনি একদা জামায়াতের সাথে জোট করার কারণে নিজ দল বিএনপি ছেড়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলিডিপি গঠন করেছিলেন। সেই তিনি যোগ দিয়েছেন জামায়াতের জোটে, সম্ভবত নিজের আসনটা পাকাপোক্ত করার জন্য।

তোমার আমেরিকায় যাওয়া আমি যেমন মানতে পারিনি, এদেশের অনেকেই মেজর আখতারুজ্জামান কিংবা অলি আহমেদের এই জোট বাঁধাকে ভালো মতো নেননি। সেই কথাটাই মনে পড়েছে অনেকের- ‘একবার রাজাকার চিরকাল রাজাকার কিন্তু এককালীন মুক্তিযোদ্ধা চিরকালীন মুক্তিযোদ্ধা নয়’। একজন অলি সাহেবের নাম লিখেছেন এভাবে- ‘কর্নেল (অ) অলি আহমেদ বীরবিভ্রম’!

আর এদিকে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আবদুল করিম খন্দকার (এ.কে. খন্দকার)। তুনাবী, তুমি কি শুনেছো, খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেছে? নিরবে তিনি চলে গেলেন।   

তুনাবী, আজও আমি বুঝতে পারি না যে তুমি আমার ‘প্রেমবিভ্রম’ কিনা। আমি ভালো নেই তুনাবী কারণ ক্ষমতার প্রতি নতজানু হয়ে হাঁটুর বয়সীদের সামনে বসিয়ে আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারবো না। সম্ভবত একারণে আমি কোনও জাতীয় পুরষ্কার পাইনি, ভবিষ্যতেও পাবো না।

২৪’এর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার যা দেওয়া হয়েছে এবছরের ফেব্রুয়ারিতে, সেখানে লেখক, প্রাবন্ধিক সলিমুল্লাহ খানকে উপদেষ্টা ও বাংলা একাডেমির পরিচালকদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবিটা ভাইরাল হলে মানুষ ট্রল করা শুরু করে। সলিমুল্লাহ খান সাহেব জানান, পুরস্কার দেয়ার সময়ে তারা এই বেইজ্জত করেছে, ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তারা সামনে বসেছেন আর পুরস্কার প্রাপ্তরা পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তুনাবী প্রেম বা স্বাধীনতা কখনও দাসত্ব শেখায় না। আমাকে ছেড়ে তুমি যে চলে গেছো, তার একটা বড় কারণ এই নতজানু হতে না পারা। তুনাবী তুমি জানো ভারতীয় সিনেমা, গজল আর দর্শনীয় স্থান আমি ভালোবাসি, তোমাকে নিয়ে সেখানে ঘুরতেও গেছি। তার মানে এই নয় যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নতজানু শর্ত চাপিয়ে দিতে হবে।

শর্ত দিয়ে যেমন ভালোবাসা হয় না তেমনি দাদাগিরি চাপিয়ে দিয়ে সম্পর্ক হয় না। তুমি আর ভারত একই মানসিকতার তুনাবী! তোমার আমার সম্পর্কের মতোই এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক!

তুনাবী আমি ভালো নেই একারণে যে আমি সৈয়দ জামিলের মতো এত সাহসী নই। তোমার বাবার সামনে আমি বলতে পারিনি যে তোমাকে আমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। কিন্তু শিল্পকলার সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল যেভাবে ২০২৫ এর ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম মুনীর চৌধুরী নাট্য উৎসবের শেষ দিনে মঞ্চে উঠে পদত্যাগের ঘোষণা দেন আমি কখনও তেমন করে তোমার সাথে সম্পর্কছেদের ঘোষণা দিতে পারবো না।

সৈয়দ জামিল যেমন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন, আমি তেমন করে তোমার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ তুলতে পারবো না তুনাবী। বিয়ের যৌতুকের মতো ভালোবাসার সুবিধা নিয়ে আমি নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া কিংবা মাহফুজ সাহেবদের মতো কোনও পদ বাগিয়ে নিতে কিংবা কোনও পদ থেকে পদত্যাগ করতে পারবো না। প্রেম চিরকালীন তুনাবী। প্রেমিক কিংবা বিপ্লবী কেউ কখনও দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে পারে না। প্রেম আমাকে সর্বহারা করেছে, আমি আরও সর্বহারা হয়ে মরতে চাই।

আমি ভালো নেই তুনাবী। থানমণ্ডির ৩২ নম্বর এখন সর্বহারা এক স্মৃতি। কতবার আমরা ধানমণ্ডি ৩২ নস্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়েছি মনে আছে তোমার? হয়তো হিসেব নেই। কিন্তু এ পর্যন্ত তিনবার ভাঙ্গা আর আগুন দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। আগুন কি সবকিছু পোড়াতে পারে? তুনাবী তোমার বাবা আমাদের সব ছবি ও চিঠি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। তোমার অবহেলার আগুন এখনও পোড়ায় নিরন্তর। তোমার জন্য প্রতীক্ষার যে পথ, কোনও আগুনই সেখান থেকে আমাকে ফেরাতে পারেনি, স্বাধীনতার সূতিকাগার খ্যাত ৩২ নম্বরকেও পুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয় কোনও আগুনেই!

ধর্ম অবমাননার মিথ্যে অভিযোগে যেভাবে দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনি দেবার পর গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, রাজবাড়িতে যেভাবে কবর থেকে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তেমন কিছু আগুনে পুড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তুনাবী, যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে না, তাদের কেউ কি আছে ক্ষমতার কাছাকাছি? তারাই কি এমন মানুষ ও মাজার পুড়িয়ে দিচ্ছে? হৃদয় ছাড়া ভালোবাসার আর কোনও আবাসস্থল নেই।

তুনাবী, আমার হৃদয়ই তোমার আবাসস্থল। তুমি যখন বাংলাদেশে এসেছিলে তখন আমি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে পারতাম। তুমি তো জানো জোর করে ক্ষমতা দখল করা যায়, ক্ষমতায় কিছুদিন টিকেও থাকা যায়, ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তুনাবী, গায়িকা ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের মতো আমি তোমাকে জোর করে গ্রেফতার কিংবা কবি গালিবের মতো জেলে পুরতে পারবো না। আওয়ামী লীগকে সব দোষ দেওয়ার মতো তোমার ঘাড়েও কোনও দোষ চাপাতে পারবো না। সব নদী মোহনায় মেলে না তুনাবী। নিয়তি যাকে খায় আমার মতো কুড়ে কুড়ে খায়। নিয়তি ছাড়া আমার কোনও সম্বল নেই, নিয়তিই আমার একমাত্র পুরস্কার।

চিন্তক, লেখক বদরুদ্দীন উমর, যাকে আমার মনে হয় পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে বিজয় মাপা মানুষ, তিনি কিন্তু স্বাধীনতা পুরস্কার নেননি। এর আগেও তিনি কোনও পুরস্কার গ্রহণ করেননি। তিনি মারা গেছেন এবছর। তুনাবী, সবাই কিন্তু এমন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচতে পারে না। কেউ বানাতে চায় কিংস পার্টি, কেউ উপদেষ্টা, আর কেউ কেউ আলোচনার জন্ম দিতে প্রেস সচিব হয়ে বসেন।

ক্ষমতা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উপাদেয়, সবাই আঁকড়ে থাকতে চায়। আর আমি? তুনাবী, তোমাকে পাবো না জেনেও তোমাকে আমি আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই। তুমি ফিরবে এই আশাতেই বুক বাঁধি।

তুমি কি কখনও ফিরে আসবে তুনাবী? মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনার ফাঁসি হয়েছে, সম্ভবত উনি আর ফিরবেন না। কেউ কেউ বলেন তিনি যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানেই চলে গেছেন। কিন্তু তারেক রহমানের কথাটা একবার ভাবো। ২৫ ডিসেম্বর তিনি যখন দেশে ফেরেন, লাখো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন তাকে স্বাগত জানাতে! নিয়তি এমনই। কাউকে আকাশে তোলে, কাউকে ফেলে দেয় খাদে। যিনি আকাশের কাছাকাছি আছেন হয়তো তার ভাবনাতে থাকে না যে একদিন তাকেও খাদে পড়তে হতে পারে।

তুনাবী তুমি হৃদয় আকাশে আছো। আর এই আকাশ থেকেই ভেঙ্গে পড়ে যুদ্ধ বিমান, প্রাণ যায় শিশুদের। উত্তরার মাইলস্টোন ট্র্যাজিডিতে যে শিশুরা মারা গেছে, তাদের বাবা মা’রা এই শোক যেমন আজীবন বয়ে বেড়াবেন, আমিও তোমাকে হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবো আজীবন। ভালোবাসা যারে খায় তার পরিণতি আমার মতোই হয়।

তবু ভালোবাসা চিরজীবী হোক।

ভালো থেকো তুনাবী।

 

ইতি
দোমার চালচুলোহীন
মুনাদ

 

লেখক: রম্যলেখক

 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ও খালেদা জিয়ার প্রয়াণের বছরকে বিদায়

আপডেট সময় : ০৯:০২:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

প্রিয় তুনাবী,

এই প্রথম জানতে চাইবো না কেমন আছো তুমি?

আমি ভালো নেই তুনাবী। তুমি জানো যে বাংলাদেশের একান্ত স্বজন নিঃসঙ্গ শেরপা’র মতো এক নিঃসঙ্গ সারথি বিদায় নিয়েছেন ৩০ ডিসেম্বর। তিনি প্রথম নিঃসঙ্গ হন ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে তার স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান, তাকে ও তাঁর দুই সন্তানকে ‘অকূল পাথারে’ ফেলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘যুদ্ধে’ গিয়েছিলেন। দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি সীমাহীন বিপদে পড়েছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৬। নিয়তি এই যে, দশ বছর পরে ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। নিঃসঙ্গতার শাড়ি চিরস্থায়ী হয়ে যায় তখন। রাজনৈতিক বাস্তবতা ২০১০ থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি এবং খুব সাধারণ মানুষের কান্না শতাব্দীর দেয়ালে তাঁর নাম খোদাই করে লিখে রেখেছে। কেউ কী দেখেছে জানাযা এমন?

তুনাবী এবার বলো অভিবাসীদের প্রতি আগাগোড়া নির্মম ডোনাল্ড  ট্রাম্পের দেশে কেমন কাটছে তোমার? হয়তো তোমার পাসপোর্ট আছে, তোমার ভয় নেই। কিন্তু আমি ভালো নেই, নিদারুন ভয়ে আছি! মনে হচ্ছে কোনও এক নিঃশব্দ আততায়ী খুব কাছে এসে আমাকে বুলেট ভালোবাসায় বিদ্ধ করে চলে যাবে। নিথর আমার ঠাঁই হবে প্রথম মেডিক্যালের কোনও এক বিছানায়, তারপর আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম করুনা করে নিয়ে যাবে আমাকে কোনও নামহীন গোত্রহীন কবরে!

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী যেভাবে নিহত হয়েছেন, তার খুনিদের যেমন করে সযতনে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, আমার আততায়ীও তেমন করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে দেশে অথবা বিদেশে।

তুনাবী, আমার প্রেমকে খুন করে যেমন করে তুমি ঘুরে বেড়াচ্ছ আমেরিকায়।

তুনাবী, এনসিপির মতো হতে পারিনি বলে আমি ভালো নেই। তোমাকে হারিয়ে আমি জীবনভর অপেক্ষা করে আছি। আর পারতাম দেবদাসের মতো নিজেকে শেষ করে ফেলতে। তবু যৌতুক নিয়ে বিয়ে কিংবা অন্য কারো প্রেমে বিলীন হতে পারতাম না। বাচ্চাদের দল খ্যাত এনসিপি তাই-ই করেছে। নির্বাচনি যৌতুকের নিশ্চয়তা পেতে তারা জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনি জোট বেঁধেছে।

স্বৈরাচারের পতনের সময় জুলাই জাগরণে তোলা আকাশছোঁয়া স্লোগান- ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’কেই সত্য ভাবছেন অনেকে। ভাবছেন যারা সৃষ্টি করেছিল এনসিপিকে, এনসিপি তাদের ছাতির নিচেই আশ্রয় নিয়েছে। এই ছাতার কারণে জামায়াতেই বিলীন হবে এনসিপি। আরও একজন আছেন যার নাম কর্নেল অলি আহমেদ, বীরক্রিম। যিনি একদা জামায়াতের সাথে জোট করার কারণে নিজ দল বিএনপি ছেড়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলিডিপি গঠন করেছিলেন। সেই তিনি যোগ দিয়েছেন জামায়াতের জোটে, সম্ভবত নিজের আসনটা পাকাপোক্ত করার জন্য।

তোমার আমেরিকায় যাওয়া আমি যেমন মানতে পারিনি, এদেশের অনেকেই মেজর আখতারুজ্জামান কিংবা অলি আহমেদের এই জোট বাঁধাকে ভালো মতো নেননি। সেই কথাটাই মনে পড়েছে অনেকের- ‘একবার রাজাকার চিরকাল রাজাকার কিন্তু এককালীন মুক্তিযোদ্ধা চিরকালীন মুক্তিযোদ্ধা নয়’। একজন অলি সাহেবের নাম লিখেছেন এভাবে- ‘কর্নেল (অ) অলি আহমেদ বীরবিভ্রম’!

আর এদিকে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর-উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আবদুল করিম খন্দকার (এ.কে. খন্দকার)। তুনাবী, তুমি কি শুনেছো, খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেছে? নিরবে তিনি চলে গেলেন।   

তুনাবী, আজও আমি বুঝতে পারি না যে তুমি আমার ‘প্রেমবিভ্রম’ কিনা। আমি ভালো নেই তুনাবী কারণ ক্ষমতার প্রতি নতজানু হয়ে হাঁটুর বয়সীদের সামনে বসিয়ে আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারবো না। সম্ভবত একারণে আমি কোনও জাতীয় পুরষ্কার পাইনি, ভবিষ্যতেও পাবো না।

২৪’এর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার যা দেওয়া হয়েছে এবছরের ফেব্রুয়ারিতে, সেখানে লেখক, প্রাবন্ধিক সলিমুল্লাহ খানকে উপদেষ্টা ও বাংলা একাডেমির পরিচালকদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবিটা ভাইরাল হলে মানুষ ট্রল করা শুরু করে। সলিমুল্লাহ খান সাহেব জানান, পুরস্কার দেয়ার সময়ে তারা এই বেইজ্জত করেছে, ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তারা সামনে বসেছেন আর পুরস্কার প্রাপ্তরা পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তুনাবী প্রেম বা স্বাধীনতা কখনও দাসত্ব শেখায় না। আমাকে ছেড়ে তুমি যে চলে গেছো, তার একটা বড় কারণ এই নতজানু হতে না পারা। তুনাবী তুমি জানো ভারতীয় সিনেমা, গজল আর দর্শনীয় স্থান আমি ভালোবাসি, তোমাকে নিয়ে সেখানে ঘুরতেও গেছি। তার মানে এই নয় যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নতজানু শর্ত চাপিয়ে দিতে হবে।

শর্ত দিয়ে যেমন ভালোবাসা হয় না তেমনি দাদাগিরি চাপিয়ে দিয়ে সম্পর্ক হয় না। তুমি আর ভারত একই মানসিকতার তুনাবী! তোমার আমার সম্পর্কের মতোই এখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক!

তুনাবী আমি ভালো নেই একারণে যে আমি সৈয়দ জামিলের মতো এত সাহসী নই। তোমার বাবার সামনে আমি বলতে পারিনি যে তোমাকে আমি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। কিন্তু শিল্পকলার সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল যেভাবে ২০২৫ এর ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম মুনীর চৌধুরী নাট্য উৎসবের শেষ দিনে মঞ্চে উঠে পদত্যাগের ঘোষণা দেন আমি কখনও তেমন করে তোমার সাথে সম্পর্কছেদের ঘোষণা দিতে পারবো না।

সৈয়দ জামিল যেমন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন, আমি তেমন করে তোমার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ তুলতে পারবো না তুনাবী। বিয়ের যৌতুকের মতো ভালোবাসার সুবিধা নিয়ে আমি নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়া কিংবা মাহফুজ সাহেবদের মতো কোনও পদ বাগিয়ে নিতে কিংবা কোনও পদ থেকে পদত্যাগ করতে পারবো না। প্রেম চিরকালীন তুনাবী। প্রেমিক কিংবা বিপ্লবী কেউ কখনও দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে পারে না। প্রেম আমাকে সর্বহারা করেছে, আমি আরও সর্বহারা হয়ে মরতে চাই।

আমি ভালো নেই তুনাবী। থানমণ্ডির ৩২ নম্বর এখন সর্বহারা এক স্মৃতি। কতবার আমরা ধানমণ্ডি ৩২ নস্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়েছি মনে আছে তোমার? হয়তো হিসেব নেই। কিন্তু এ পর্যন্ত তিনবার ভাঙ্গা আর আগুন দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। আগুন কি সবকিছু পোড়াতে পারে? তুনাবী তোমার বাবা আমাদের সব ছবি ও চিঠি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। তোমার অবহেলার আগুন এখনও পোড়ায় নিরন্তর। তোমার জন্য প্রতীক্ষার যে পথ, কোনও আগুনই সেখান থেকে আমাকে ফেরাতে পারেনি, স্বাধীনতার সূতিকাগার খ্যাত ৩২ নম্বরকেও পুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয় কোনও আগুনেই!

ধর্ম অবমাননার মিথ্যে অভিযোগে যেভাবে দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনি দেবার পর গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, রাজবাড়িতে যেভাবে কবর থেকে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তেমন কিছু আগুনে পুড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তুনাবী, যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে না, তাদের কেউ কি আছে ক্ষমতার কাছাকাছি? তারাই কি এমন মানুষ ও মাজার পুড়িয়ে দিচ্ছে? হৃদয় ছাড়া ভালোবাসার আর কোনও আবাসস্থল নেই।

তুনাবী, আমার হৃদয়ই তোমার আবাসস্থল। তুমি যখন বাংলাদেশে এসেছিলে তখন আমি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে পারতাম। তুমি তো জানো জোর করে ক্ষমতা দখল করা যায়, ক্ষমতায় কিছুদিন টিকেও থাকা যায়, ভালোবাসা পাওয়া যায় না। তুনাবী, গায়িকা ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের মতো আমি তোমাকে জোর করে গ্রেফতার কিংবা কবি গালিবের মতো জেলে পুরতে পারবো না। আওয়ামী লীগকে সব দোষ দেওয়ার মতো তোমার ঘাড়েও কোনও দোষ চাপাতে পারবো না। সব নদী মোহনায় মেলে না তুনাবী। নিয়তি যাকে খায় আমার মতো কুড়ে কুড়ে খায়। নিয়তি ছাড়া আমার কোনও সম্বল নেই, নিয়তিই আমার একমাত্র পুরস্কার।

চিন্তক, লেখক বদরুদ্দীন উমর, যাকে আমার মনে হয় পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে বিজয় মাপা মানুষ, তিনি কিন্তু স্বাধীনতা পুরস্কার নেননি। এর আগেও তিনি কোনও পুরস্কার গ্রহণ করেননি। তিনি মারা গেছেন এবছর। তুনাবী, সবাই কিন্তু এমন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচতে পারে না। কেউ বানাতে চায় কিংস পার্টি, কেউ উপদেষ্টা, আর কেউ কেউ আলোচনার জন্ম দিতে প্রেস সচিব হয়ে বসেন।

ক্ষমতা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি উপাদেয়, সবাই আঁকড়ে থাকতে চায়। আর আমি? তুনাবী, তোমাকে পাবো না জেনেও তোমাকে আমি আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই। তুমি ফিরবে এই আশাতেই বুক বাঁধি।

তুমি কি কখনও ফিরে আসবে তুনাবী? মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনার ফাঁসি হয়েছে, সম্ভবত উনি আর ফিরবেন না। কেউ কেউ বলেন তিনি যেখান থেকে এসেছিলেন, সেখানেই চলে গেছেন। কিন্তু তারেক রহমানের কথাটা একবার ভাবো। ২৫ ডিসেম্বর তিনি যখন দেশে ফেরেন, লাখো মানুষ জড়ো হয়েছিলেন তাকে স্বাগত জানাতে! নিয়তি এমনই। কাউকে আকাশে তোলে, কাউকে ফেলে দেয় খাদে। যিনি আকাশের কাছাকাছি আছেন হয়তো তার ভাবনাতে থাকে না যে একদিন তাকেও খাদে পড়তে হতে পারে।

তুনাবী তুমি হৃদয় আকাশে আছো। আর এই আকাশ থেকেই ভেঙ্গে পড়ে যুদ্ধ বিমান, প্রাণ যায় শিশুদের। উত্তরার মাইলস্টোন ট্র্যাজিডিতে যে শিশুরা মারা গেছে, তাদের বাবা মা’রা এই শোক যেমন আজীবন বয়ে বেড়াবেন, আমিও তোমাকে হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবো আজীবন। ভালোবাসা যারে খায় তার পরিণতি আমার মতোই হয়।

তবু ভালোবাসা চিরজীবী হোক।

ভালো থেকো তুনাবী।

 

ইতি
দোমার চালচুলোহীন
মুনাদ

 

লেখক: রম্যলেখক