ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রশাসনের গত ১৭ মাসের শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় যে গভীর ক্ষত ও অস্থিতিশীলতা পরিলক্ষিত হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে তা এক চরম ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর উচ্চঝুঁকি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য, তথা “ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স” বা OSINT, রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং সামাজিক অস্থিরতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমাদের কাছে এটি প্রতীয়মান হয় যে—রাষ্ট্র বর্তমানে একটি অস্তিত্ব সংকটের (existential crisis) মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। সশস্ত্র অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির উত্থান এবং প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আইনি জটিলতা
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তার জানাজায় নজিরবিহীন মানুষের সমাগম ও জনসহানুভূতির যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা আপাতদৃষ্টিতে দলটির জনসমর্থন এবং ভোটব্যাংক ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও এর স্থায়িত্ব দুই সপ্তাহের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অপরদিকে, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে আসন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘাত এই দুই প্রাক্তন মিত্রের পুনর্মিলন বা নতুন সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টায় সার্বিক পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে; এমনকি অপহরণ ও গুমসহ মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করার মতো ঘটনা ঘটার উপক্রম দেখা দিচ্ছে। একইসঙ্গে, দীর্ঘ ১৭ মাস ‘অদৃশ্য’ থাকা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের আকস্মিক ‘ফ্ল্যাশমব উপস্থিতি’ ও রাজপথে সক্রিয় হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ পরিলক্ষিত।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ঢাকা প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে, তা কার্যত ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। তবে বস্তুনিষ্ঠ আইনি বিশ্লেষণ বলছে, আগামী ৬০ দিনের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ আইনত ও গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
আমরা মনে করি যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে একটি ‘কৌশলগত হাতিয়ার’ হিসেবেই ব্যবহার করছে। এটি মূলত বিএনপির বিশাল এবং দীর্ঘদিনের ‘ক্ষমতা-ক্ষুধার্ত’ ও বিক্ষুব্ধ সমর্থকদের শান্ত রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। এর মাধ্যমে সরকার মূলত নির্বাচনের আগে রাজপথে বিএনপির সম্ভাব্য সহিংসতাকে প্রশমিত করার চেষ্টা করছে, যা এখনই কোনও প্রকৃত ক্ষমতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না।
জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত আধিপত্য
বিএনপি যখন তাদের শীর্ষ নেতার প্রত্যাবর্তন ও প্রচাণা নিয়ে ব্যস্ত, আমরা লক্ষ্য করছি যে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক স্তরে নিজেদের প্রভাব সংহত করছে। ২০২৪ সালে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর তারা অত্যন্ত কৌশলে স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় নিজেদের অনুসারীদের আসীন করেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিজস্ব কোনও তৃণমূল কাঠামো না থাকায় তারা কার্যত জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। তারা একদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি উদার ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে ব্যবহার করছে, অন্যদিকে পর্দার আড়াল থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সংহত করছে।
আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাদের এই সুদূরপ্রসারী কৌশলের লক্ষ্য হলো— ভবিষ্যতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা যেন জামায়াতের আদর্শিক কাঠামো ও নির্দেশের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হয়।
নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেও আমরা এর বাস্তবায়নে নানাবিধ বাধা দেখতে পাচ্ছি। প্রচারণার জন্য নির্ধারিত ২০ দিনের সংক্ষিপ্ত সময় একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। এছাড়া আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান বিতর্ক এই নির্বাচনের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে গঠিত কোনও সংসদীয় কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ‘জুলাই আন্দোলন’ একটি স্বল্প-স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর হওয়ায় বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ড. ইউনূস প্রশাসন এদের “প্রেশার গ্রুপ” আখ্যা দিলেও এবং আপাতদৃষ্টিতে এদের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ মনে হলেও, আমাদের সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী এই গোষ্ঠীগুলো মূলত বড় আদর্শিক শক্তির বিকেন্দ্রীকৃত শাখা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত নির্দেশনায় এরা রাজপথে জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে, যাতে মূল দলটি সরাসরি দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে।
আমাদের বিশ্লেষকরা জাতীয় নাগরিক কমিটি (NCP) এবং বিভিন্ন ‘ইনকিলাব’ প্ল্যাটফর্মগুলোকে জামায়াতের ছায়া সংগঠন হিসেবেই দেখছেন। দলীয় ব্যানার ব্যবহার না করে তরুণ সমাজকে সংগঠিত করতে এবং নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে কৌশলী ‘ডিকয়’ (decoy) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডিজিটাল ন্যারেটিভ বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টেলিগ্রাম ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গোষ্ঠীগুলোর বিশাল উপস্থিতি থাকলেও আমরা দেখছি যে রাজপথে তাদের প্রকৃত জনসমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ এবং দেশব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তথ্য-উপাত্ত বলছে, তারা ‘ইনফ্লুয়েন্স ফার্ম’ বা ‘বট-প্রযুক্তির’ ওপর নির্ভরশীল। এর মাধ্যমে তারা কৃত্রিমভাবে ভারত-বিদ্বেষী, আওয়ামী লীগ ও সরকারবিরোধী জনমত তৈরি করে একটি বানোয়াট ‘জাতীয় ঐকমত্য’ প্রদর্শনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এমতাবস্থায় ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সাথে সরাসরি জড়িত প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার আমরা উচ্চ সম্ভাবনা দেখছি। এই ধরনের ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা গুপ্তহত্যার পেছনে কেবল আদর্শিক দ্বন্দ্ব নয়, বরং অন্তর্দলীয় কোন্দল, ব্যক্তিগত শত্রুতা, অর্থের ভাগবাটোয়ারা এবং প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে।
সংখ্যালঘু, ভিন্নমতালম্বী ও আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর ওপর সুপরিকল্পিত আক্রমণ
ধর্মীয় উগ্রবাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে বাংলাদেশের সামাজিক বুনন বর্তমানে হুমকির মুখে। বিশেষ করে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সুফি ও বাউলদের মতো আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর ওপর সুপরিকল্পিত হামলার উচ্চ ঝুঁকি আমরা চিহ্নিত করেছি। গত কয়েক মাসে মাজার ধ্বংসের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে। বাউলদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান, ব্লাসফেমি অভিযোগে গ্রেফতার এবং তাদের জীবনদর্শনকে অবমাননা করার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা উস্কে দিচ্ছে।
মব ভায়োলেন্স ও প্রশাসনিক পক্ষাঘাত
‘মব জাস্টিস’ বা গণ-আদালতের নামে বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে নগ্ন হস্তক্ষেপ দেশের স্বাভাবিক কর্মপ্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র দাবি করলেও আমরা লক্ষ্য করছি যে তাদের কর্মকাণ্ড মূলত বিশৃঙ্খলা ও আইনহীনতাকে ত্বরান্বিত করছে। এই ‘মব-কালচার’-এর ফলে পুরো আমলাতন্ত্র বর্তমানে এক ধরনের পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। আমরা দেখছি যে আমলারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, যা তাদের সিদ্ধান্তহীনতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সশস্ত্র অপরাধের বিস্তার
আসন্ন দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, রাষ্ট্রীয় স্থাপনা (KPI) এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানে বোমা হামলার আমরা উচ্চ সম্ভাবনা দেখছি। বিশেষ করে ‘গাড়ি বোমা’ বা আইইডি (IED) ব্যবহারের মাধ্যমে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে।
আমাদের নিরাপত্তা বিশ্লেষণে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—অখ্যাত অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি কর্তৃক ১০,০০০ তরুণকে ‘সামরিক প্রশিক্ষণ’ দেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা। ‘বিপ্লব রক্ষার’ অজুহাতে এই সশস্ত্র প্রস্তুতি রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার একক ক্ষমতার ওপর বড় আঘাত। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে পুলিশ ও স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF) অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র, যার একটি বড় অংশ আমরা লক্ষ্য করেছি এখনও উদ্ধার হয়নি। এই নিখোঁজ অস্ত্র এবং প্রশিক্ষিত সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনীর সমন্বয় দেশে বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘর্ষ বা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতির সুযোগ নিয়ে সারাদেশে সশস্ত্র ডাকাতি, ছিনতাই এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক চাঁদাবাজি বৃদ্ধির আমরা পূর্বাভাস দিচ্ছি। শিল্পাঞ্চলগুলোতে সশস্ত্র ক্যাডারদের আনাগোনা ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে বিনষ্ট করছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পুলিশ বাহিনীকে কার্যত ‘ক্ষমতাহীন’ করে রাখা হয়েছে। বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে, সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পেলেও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশন হারানোর ভয়ে তারা কঠোর কোনও পদক্ষেপ নিতে দ্বিধাগ্রস্ত। এর ফলে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।
উগ্রবাদ ও জিহাদি তৎপরতা: স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মাত্রা
বর্তমানে বাংলাদেশে আল-কায়েদা বা আইসিসের (ISIS) মতো transnational jihadist গোষ্ঠীর সরাসরি পদচারণা দৃশ্যমান না হলেও, নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীর একটি শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ক্ষমতা পরিবর্তনের নেপথ্যে এই সংগঠনটির একটি বড় ও গোপন কৌশলগত ভূমিকা ছিল। তারা বর্তমানে স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মকে রাষ্ট্রবিরোধী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করার কারিগর হিসেবে কাজ করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আফগান তালেবানের উচ্চপদস্থ নেতা এবং পাকিস্তান-ভিত্তিক উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রতিনিধিদের বাংলাদেশে গোপন সফরের ধারাবাহিক প্রতিবেদন। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, তালেবানের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা স্থানীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কৌশলগত নির্দেশনা দিতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এছাড়া জৈশ-ই-মোহাম্মদ (JeM) এর মতো সংগঠনের তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রশাসনিক শূন্যতাকে ব্যবহার করে তারা দেশে ‘ট্রানজিট হাব’ ও প্রশিক্ষণ সেল তৈরির চেষ্টা করছে।
ড. ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় আসার পর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ (ABT) বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
আমরা মনে করি এই দুর্ধর্ষ নেতাদের মুক্তি এবং তাদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
উগ্রবাদ এখন মূলত ‘প্যাক অ্যাটাক’ (দলবদ্ধ আক্রমণ), হুমকি এবং লাঠিসোটার প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উগ্রবাদী প্রচারণার মাধ্যমে তরুণদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো—আমাদের অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে যে বর্তমান প্রশাসন এই ধরনের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এক ধরনের selective amnesia প্রদর্শন করছে, যা এই গোষ্ঠীগুলোকে পরোক্ষভাবে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব
প্রতিবেশী ভারতের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, তথাকথিত বিপ্লবী ছাত্রনেতৃত্ব ভারতকে প্রতিবেশী হিসেবে দেখার বদলে একটি আধিপত্যবাদী শত্রু হিসেবে চিত্রায়িত করছে। এই প্রচারণার ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া মাদক সিন্ডিকেট ও ‘ইয়াবা গডফাদারদের’ আনাগোনা রাজনীতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগামী ৬০ দিনের জন্য আমাদের তিনটি প্রধান নিরাপত্তা সর্তকতা:
১. উচ্চ ঝুঁকির হামলা: অপহরণ, গুমসহ মুক্তিপণের জন্য জিম্মি, বোমা হামলা এবং টার্গেটেড কিলিংয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী চরম আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।
২. সশস্ত্র অস্থিরতা: প্রশিক্ষিত সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং চাঁদাবাজি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাবে।
৩. সাম্প্রদায়িক ও সাংস্কৃতিক সংঘাত: ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সুফি-বাউলদের ওপর পরিকল্পিত হামলা দেশের সামাজিক সহাবস্থানকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার সুযোগে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তি ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে আগামী ৬০ দিনে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
লেখক: সঙ্গীত শিল্পী, কলাম লেখক ও ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষক
রিপোর্টারের নাম 
























