দেশের ভূ-কৌশলগত সংযোগ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পার্বত্য অঞ্চলের বহুমুখী অর্থনৈতিক অবদান এবং টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনা।
শহুরে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে আমরা যখন সাজেক বা নীলগিরির মেঘে ঢাকা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ায়, তখন আমাদের দৃষ্টি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে কিন্তু গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান কেবল ভ্রমণের জায়গা নয়, বরং বাংলাদেশের এক অভেদ্য ‘ইকোনমিক ফোরট্রেস’ বা অর্থনৈতিক দুর্গ। এই অঞ্চলটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে, যা মূল অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি উন্নয়নের নতুন নতুন রসদ সরবরাহ করে টিকে থাকার সাহস জোগায়।
গত এক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, তা আমাদের জাতীয় জিডিপিতে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ করছে। এক সময়কার অশান্তির মেঘ সরিয়ে দেশের মোট আয়তনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ এই অঞ্চলটি আজ খাদ্যনিরাপত্তা এবং অপ্রচলিত রফতানি পণ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সমতলের কৃষি যখন সার আর জমির স্বল্পতায় চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন আমাদের পাহাড়গুলো হয়ে উঠেছে ‘গ্রিন গোল্ড’ বা সবুজ স্বর্ণের আধার।
পাহাড়ের এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূলে রয়েছে প্রচলিত জুম চাষের পরিবর্তে উচ্চমূল্যের উদ্যান কৃষির ব্যাপক প্রসার। রুমা বা থানচির পাহাড়ি ঢালগুলোতে এখন ধান বা তিলের পাশাপাশি কফি ও কাজু বাদামের মতো দামী ফসলের চাষ হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির আম, মাল্টা এবং ড্রাগন ফল আমদানিনির্ভর ফলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বান্দরবানের আম স্বাদে ও মানে দেশের সেরা অঞ্চলগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা রাখে। এটি কেবল সাধারণ বাগান নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতির এক বিশাল বৈচিত্র্যকরণ। কাজু বাদাম ও কফির বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ এখন নিজের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছে, যা ভবিষ্যতে পোশাকশিল্পের বাইরে রফতানি ঝুড়িতে এক শক্তিশালী স্তম্ভ যোগ করতে পারে।
তবে এই উন্নয়নের পেছনে ইতিহাসের কিছু ত্যাগও মিশে আছে। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে যে বিশাল জনপদ ও উর্বর কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছিল, তার বিনিময়ে আজ আমরা পাচ্ছি বিপুল পরিমাণ মাছ ও বিদ্যুৎ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম স্বাদু পানির মাছের আধার হিসেবে কাপ্তাই হ্রদ এখন দেশের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাতকে ‘ইনভিজিবল এক্সপোর্ট’ বা অদৃশ্য রফতানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে পণ্য ক্রেতার কাছে যায় না, বরং ক্রেতা নিজেই সৌন্দর্যের টানে পাহাড়ের কাছে চলে আসে, যার ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বিপুল অর্থের প্রবাহ ঘটে। সাজেক ভ্যালি বা বগা লেকের পর্যটন কেবল রিসোর্ট মালিকদের লাভবান করছে না, বরং স্থানীয় হস্তশিল্প, তাঁত ও পরিবহন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত প্রান্তিক পরিবারগুলোর আয়ের পথ খুলে দিয়েছে।
তবে এই উন্নয়নের জোয়ারে যেন পাহাড়ের অকৃত্রিম প্রকৃতি ও সংস্কৃতি হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। পাহাড়ের মানুষকে সাথে নিয়ে ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ গড়ে তোলা গেলে এই উন্নয়ন আরও টেকসই হবে। এছাড়া থানচি-আলীকদমের মতো আধুনিক সড়ক অবকাঠামো পাহাড়ের দুর্গম এলাকার কৃষিপণ্যকে দ্রুততম সময়ে ঢাকার বাজারে পৌঁছে দিচ্ছে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে সরাসরি কৃষকের হাতে মুনাফা পৌঁছে দিচ্ছে। কৌশলগতভাবে এই সড়কগুলো ভবিষ্যতে ভারত ও মিয়ানমারের সাথে আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল করিডোর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে।
রাবার, সেগুন কাঠ এবং পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অমূল্য সম্পদ। অভ্যন্তরীণ রাবার ও কাঠের চাহিদার বড় অংশই এখন পাহাড় থেকে মেটানো হচ্ছে। পাহাড়ের বনজ সম্পদকে রক্ষা করে যদি ভেষজ ঔষধ বা হার্বাল মেডিসিন শিল্পের দিকে নজর দেওয়া যায়, তবে এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ‘ফার্মাসিউটিক্যাল হাব’ হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পাহাড়ের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কারিগরি দক্ষতায় বিনিয়োগ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের ফুসফুস বলা হয়, কারণ এটি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে। তাই পাহাড়ের উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে। পাহাড়ের ঝরনা ও হ্রদ মরে গেলে তার প্রভাব পুরো দেশের বিদ্যুৎ ও মৎস্য খাতে পড়বে। পরিশেষে, পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির কোনো প্রান্তিক অঞ্চল নয়, বরং এটি উন্নয়নের এক অপ্রতিরোধ্য পাওয়ার হাউজ। পাহাড়ের এই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অধিকারের গল্পকে মমতাময় ও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে আগলে রাখলে আমাদের স্বাধীনতার অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো পূর্ণতা পাবে।
রিপোর্টারের নাম 

























