ঢাকা ০২:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় ও জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতার তারিখ হয়ে থাকবে ৩০ ডিসেম্বর। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পথচলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির অভিভাবক, গণতন্ত্রের অভিভাবক- খালেদা জিয়ার বিদায় এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও প্রতিহিংসার চক্রে ঘুরছে। পারস্পরিক অবিশ্বাস, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক অনমনীয়তা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। ঠিক এই সংকটকালেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এক বিরল দৃশ্য-একজন অসুস্থ নেত্রীকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে গড়ে ওঠা মানবিক ঐক্য। এই ঐক্য কোনও কৌশলগত সমঝোতা নয়; এটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বোধের প্রকাশ।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নাম। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন বাস্তবতার চাপ থেকে উদ্ভূত হলেও নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন নিজস্ব যোগ্যতা, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে। অভিজ্ঞতার অভাব সত্ত্বেও তিনি দ্রুত হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক শক্তি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯১ সালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, নারী শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল সংযম, ধৈর্য ও দৃঢ়তা-যা তাঁকে কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, মানুষের স্মৃতি ও আবেগের অংশ করে তোলে।

দীর্ঘ কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অপপ্রচার এবং শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও খালেদা জিয়া যে মর্যাদা ও ধৈর্য বজায় রেখেছেন, তা তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করেছে। তাই তাঁর শেষ সময়ে দেশজুড়ে যে দোয়া ও উদ্বেগ দেখা গেছে, তা নিছক দলীয় আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির কৃতজ্ঞতা ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।

এই মানবিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই দেশের রাজনীতিতে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী ঐক্যের চিত্র। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানানো হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মর্যাদা’ প্রদান এবং চিকিৎসায় সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে একজন নেত্রীর প্রতি সম্মানের দৃষ্টান্ত।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা দলগুলো এবং এমনকি বিএনপির কঠোর সমালোচকরাও এই সময়ে মানবিক অবস্থান নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কণ্ঠে একটাই উচ্চারণ শোনা গেছে-“খালেদা জিয়া সুস্থ হোন।” বিভাজনের রাজনীতির দেয়ালে যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও আলো ফুটেছিল।

২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলন আমাদের দেখিয়েছিল, জাতীয় ঐক্য কীভাবে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে শক্তিতে রূপ নিতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের পর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক হিসাব সেই ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। এটি স্বাভাবিক হলেও এই মুহূর্তে বিপজ্জনক। কারণ এখন ঐক্যহীনতা আমাদের আবার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে-যেখানে গণতন্ত্র, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বারবার বিপন্ন হয়।

আজ বাংলাদেশ যখন আরেকটি রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে, তখন খালেদা জিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মানবিক ঐক্য আমাদের যে মৌলিক শিক্ষা দেয় তা হলো- রাজনীতি প্রতিহিংসার জন্য নয়, রাজনীতি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। মতভিন্নতা থাকবে, তর্ক হবে, ক্ষমতার প্রতিযোগিতাও থাকবে; কিন্তু মানবিকতা ও সংবেদনশীলতা হারালে রাজনীতি নিজেই আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠে।

পদ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা হারানো যায়; কিন্তু ঐক্য হারালে হারায় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় আমাদের সামনে সেই কঠিন সত্যই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদি তাঁর মৃত্যুর পরও আমরা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ঐক্যের পথে হাঁটতে পারি, তবেই তাঁর প্রতি রাষ্ট্র ও জাতির পক্ষ থেকে প্রকৃত সম্মান প্রদর্শিত হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের ওয়ানডে জয়ে বাংলাদেশের সৈকত, আইসিসি চুক্তিতে নেই বিসিবির বাধা

বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় ও জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতা

আপডেট সময় : ১১:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতার তারিখ হয়ে থাকবে ৩০ ডিসেম্বর। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পথচলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির অভিভাবক, গণতন্ত্রের অভিভাবক- খালেদা জিয়ার বিদায় এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও বিভাজন, দ্বন্দ্ব ও প্রতিহিংসার চক্রে ঘুরছে। পারস্পরিক অবিশ্বাস, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক অনমনীয়তা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। ঠিক এই সংকটকালেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এক বিরল দৃশ্য-একজন অসুস্থ নেত্রীকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে গড়ে ওঠা মানবিক ঐক্য। এই ঐক্য কোনও কৌশলগত সমঝোতা নয়; এটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বোধের প্রকাশ।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের নাম। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন বাস্তবতার চাপ থেকে উদ্ভূত হলেও নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন নিজস্ব যোগ্যতা, দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে। অভিজ্ঞতার অভাব সত্ত্বেও তিনি দ্রুত হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক শক্তি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৯১ সালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, নারী শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল সংযম, ধৈর্য ও দৃঢ়তা-যা তাঁকে কেবল রাজনৈতিক নেতা নয়, মানুষের স্মৃতি ও আবেগের অংশ করে তোলে।

দীর্ঘ কারাবরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অপপ্রচার এবং শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও খালেদা জিয়া যে মর্যাদা ও ধৈর্য বজায় রেখেছেন, তা তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে আরও গভীর করেছে। তাই তাঁর শেষ সময়ে দেশজুড়ে যে দোয়া ও উদ্বেগ দেখা গেছে, তা নিছক দলীয় আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির কৃতজ্ঞতা ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।

এই মানবিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করেই দেশের রাজনীতিতে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী ঐক্যের চিত্র। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানানো হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মর্যাদা’ প্রদান এবং চিকিৎসায় সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে একজন নেত্রীর প্রতি সম্মানের দৃষ্টান্ত।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকা দলগুলো এবং এমনকি বিএনপির কঠোর সমালোচকরাও এই সময়ে মানবিক অবস্থান নিয়েছেন। সাধারণ মানুষের কণ্ঠে একটাই উচ্চারণ শোনা গেছে-“খালেদা জিয়া সুস্থ হোন।” বিভাজনের রাজনীতির দেয়ালে যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও আলো ফুটেছিল।

২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলন আমাদের দেখিয়েছিল, জাতীয় ঐক্য কীভাবে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে শক্তিতে রূপ নিতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের পর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক হিসাব সেই ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। এটি স্বাভাবিক হলেও এই মুহূর্তে বিপজ্জনক। কারণ এখন ঐক্যহীনতা আমাদের আবার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে-যেখানে গণতন্ত্র, মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বারবার বিপন্ন হয়।

আজ বাংলাদেশ যখন আরেকটি রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে, তখন খালেদা জিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মানবিক ঐক্য আমাদের যে মৌলিক শিক্ষা দেয় তা হলো- রাজনীতি প্রতিহিংসার জন্য নয়, রাজনীতি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। মতভিন্নতা থাকবে, তর্ক হবে, ক্ষমতার প্রতিযোগিতাও থাকবে; কিন্তু মানবিকতা ও সংবেদনশীলতা হারালে রাজনীতি নিজেই আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠে।

পদ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা হারানো যায়; কিন্তু ঐক্য হারালে হারায় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় আমাদের সামনে সেই কঠিন সত্যই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদি তাঁর মৃত্যুর পরও আমরা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা, হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ঐক্যের পথে হাঁটতে পারি, তবেই তাঁর প্রতি রাষ্ট্র ও জাতির পক্ষ থেকে প্রকৃত সম্মান প্রদর্শিত হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক