ঢাকা ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

আপসহীন এক নিঃসঙ্গ সারথি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৮:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন। ছিলেন অদ্ভুত সুন্দর একজন মানুষ, নাম ছিল ‘খালেদা খানম’। বাংলাদেশের রাজনীতি তাকে বেগম খালেদা জিয়াতে রূপান্তরিত করে।

ভোটের রাজনীতিতে কখনও হারেননি তিনি। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পরাজিত হতো আসমান জমিন ব্যবধানে। শেষমেষ মৃত্যুর কাছে হারলেন তিনি। চলে গেলেন ‘অজানা আসমানে’! জীবন এবং ইতিহাস কাউকে অপরিহার্য করে না। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে ‘নিঃসঙ্গ’ করে তুলেছিল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনসমূহে এই ‘নিঃসঙ্গ’ প্রভাব কতটা পড়বে সময়ই তা বলে দেবে।

নিঃসঙ্গ শেরপা’র মতো তিনি নিঃসঙ্গ সারথি ছিলেন। প্রথম নিঃসঙ্গ হন ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে তার স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান, তাকে ও তাঁর দুই সন্তানকে ‘অকূল পাথারে’ ফেলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘যুদ্ধে’ গিয়েছিলেন। দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি সীমাহীন বিপদে পড়েছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৬।

নিয়তি এই যে, দশ বছর পরে ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। নিঃসঙ্গতার শাড়ি চিরস্থায়ী হয়ে যায় তখন। রাজনৈতিক বাস্তবতা ২০১০ থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল।

নিঃসঙ্গতার সাথে সাথে বন্ধুত্বহীন জীবনের শুরু ১৯৮২ থেকে। লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের মৃত্যু ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যাওয়ার হিড়িক পড়েছিল তখন। বিএনপির সিনিয়র নেতারা, যারা এসেছিলেন অন্যদল থেকে, তারা আবারও ক্ষমতার হালুয়া রুটির লোভে পড়েছিলেন, বুঝতে পারেননি ততদিনে যে একা পথ চলার অভ্যাস হয়ে গেছে খালেদা জিয়ার!

এরশাদ বিরোধিতায় তিনি ক্রমশঃ হয়ে উঠেছিলেন ‘আপসহীন’। এই আপসহীনতার বাঁশি রাজপথে টেনে এনেছিল ছাত্রদের। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত বাংলাদেশের কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জয়জয়াকার। নির্বাচনেও জিততো তারা। এই জয়জয়াকারই ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এনেছিল বিএনপিকে। তখন তাঁর বয়স ৪৬। তিনি বাংলাদেশের সবচাইতে নিরপেক্ষ নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর কী তিনি বদলে গিয়েছিলেন? অনাগত সময় সেই বিচার করবে।

স্মৃতি নিয়েও একা থাকতে থাকতে পারেননি দীর্ঘদিন। ২০০৯ থেকেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল জিয়ার বাসভবন, জিয়ার মৃত্যুর পরে যেটা দেওয়া হয়েছিল তাঁর পরিবারকে, সেখান থেকে তার ভাষায় ‘এক কাপড়ে’ উচ্ছেদ করা হয় ২০১০ এর ১০ সেপ্টেম্বর। আক্ষেপ করে বলেছিলেন-‘এখন থেকে আমি বাস্তুহারা’! পয়ষট্টি বছর বয়সে দীর্ঘশ্বাস ও চোখের জলে আরেকবার নিঃসঙ্গ হয়েছিলেন তিনি।

রাজনীতি নিয়ে অনেক প্রবাদের একটা হচ্ছে এমন-‘দেশের জন্য মিছিলে নামে অনেকেই। ক্ষমতার বাতাস এরপর অনেককেই দূষিত করে তোলে।‘ ১৯৯৪ খেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ এর পুরোটা সময় তিনি এমন বৈরী বাতাসের মুখোমুখি হয়েছিলেন। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রথম বিতর্কের মুখে পড়েছিল তার আমলেই। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, সার নিয়ে আন্দোলন ও পুলিশের গুলিতে কৃষকদের মৃত্যু, ইয়াসমীন হত্যা ও ধর্ষণ, ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো, সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা, আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা, বাংলা ভাই শায়খ আব্দুর রহমান তথা উগ্রবাদীদের উত্থানে তাঁর প্রতি সমালোচনা তীব্র হয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় দেরি ও  ‘আপসহীন নীরবতা’র কারণেই এমন হয়েছিল কিনা সেই প্রশ্ন বিদায় বেলায় আর না তুলি।

মুচলেকা দিয়ে (সম্ভবত) তারেক রহমান দেশ ছাড়েন ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির আগে মা ও ছেলের আর দেখা হয়নি। দশ বছর আগের আরেক জানুয়ারিতে (২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ) আরাফাত রহমান কোকো মারা যান মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। মৃত্যকালে কোকোর সাথে তারেক রহমানের দেখা হয়নি। খালেদা জিয়ার কান্নায় মন ভেঙ্গে দিয়েছিল ভক্ত সমর্থকদের। নিঃসঙ্গতাই তাকে আপন করে নিয়েছে ক্রমশঃ।

এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে তিন তিনবার আটক করা হলেও কারাগারে নেয়া হয়নি খালেদা জিয়াকে। তাঁর প্রথমবার কারাবাসের অীভজ্ঞতা হয় ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা মঈনুদ্দীন ফখরুদ্দীনের আমলে। এক বছর আট দিন পরে ২০০৮ এর সেপ্টেম্বরে তিনি মুক্ত হন যদিও প্রচলিত কারাগারে তাঁকে থাকতে হয়নি। তাঁর ও শেখ হাসিনার জন্য আলাদা সাবজেল তৈরি করা হয়েছিল। জেলে থাকা অবস্থাতেই তাঁর বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এই মামলায় ২০১৮ সালের আট ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। তাকে রাখা হয়েছিল পুরোনো ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডের কারাগারে যেটি তখন আর কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল না। এবারও তাঁকে প্রচলিত কারাগারে যেতে হয়নি কিন্তু পুরোনো বা পরিত্যক্ত জেলে তিনি একরকম একাই ছিলেন, যদিও এক সহকারি ছিল তাঁর দেখভালের জন্য। সম্ভবত নিঃসঙ্গতাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও লে.জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের পর এদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। জুলাই জাগরনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়েছে, শেখ হাসিনা সহ সরকার সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ মানুষ পালিয়েছেন। খালেদা জিয়া তার নীরবতা বা কম কথা বলার কারণে আরও বেশি জনগণ প্রিয় হয়েছেন। হয়তো দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য করেছেন তিনি।

একই সাথে রাজনীতি আবেগের জায়গা হলেও সেখানে বিরোধী মতের অস্তিত্বও প্রবল থাকে। তবু সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্র এবং শালীন মানুষের প্রতিকৃতি।

আগেই লিখেছি রাষ্ট্রের জন্যও কেউ অপরিহার্য নন। তবু বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনসমূহ এমনকি বাংলাদেশ তাঁকে হারিয়ে নিঃসঙ্গতায় ভুগবে!

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার জানাজায় লাখো মানুষ সমবেত হয়েছিলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ী জানাযায় সেই রেকর্ড নিঃসন্দেহে ভেঙ্গে যাবে। সারাদেশে জাকিয়ে বসা শীত মানুষের চোখের জলে ভেসে যাবে..

নিঃসঙ্গ জীবন থেকে তিনি চলে গেলেন চির নিঃসঙ্গতায়। এর আগে গিয়েছেন তাঁর প্রিয়তম স্বামী, আদরের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো, পরবাসে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান। তারেক ফিরেছেন। বাবার অনুপস্থিতিতে ছায়া হয়ে থাকা প্রিয়তম মায়ের ছায়াটাও আর থাকলো না। হয়তো তাকেও নিঃসঙ্গ পথেই হাঁটতে হবে।

বিদায় বেগম খালেদা জিয়া। চলে গিয়েও কেউ কেউ থেকে যান মানুষের হৃদয়ে, প্রবলভাবে। বারবার বলেছেন বিদেশে তাঁর কোনও ঠিকানা নেই। বাংলার মাটিই তাঁর ঠিকানা। এই ঠিকানাতেই তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আপামর একজন ভদ্র মানুষের প্রতিকৃতি, যাকে নিয়ে কোনও দুর্নীতির সত্য অভিযোগ নেই, তিনি যেন ছিলেন বাংলার মানুষের মা হয়ে।

শতাব্দীর দেয়ালে তাঁর নাম লেখা হয়ে গেছে খোদাই করে। বাংলাদেশ তাঁকে ভুলবে না।

লেখক: রম্যলেখক

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিএল মহারণ: আজ সিলেট-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী; টিভিতে কখন দেখবেন?

আপসহীন এক নিঃসঙ্গ সারথি

আপডেট সময় : ০৬:৩৮:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি থাকবেন। ছিলেন অদ্ভুত সুন্দর একজন মানুষ, নাম ছিল ‘খালেদা খানম’। বাংলাদেশের রাজনীতি তাকে বেগম খালেদা জিয়াতে রূপান্তরিত করে।

ভোটের রাজনীতিতে কখনও হারেননি তিনি। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পরাজিত হতো আসমান জমিন ব্যবধানে। শেষমেষ মৃত্যুর কাছে হারলেন তিনি। চলে গেলেন ‘অজানা আসমানে’! জীবন এবং ইতিহাস কাউকে অপরিহার্য করে না। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে ‘নিঃসঙ্গ’ করে তুলেছিল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনসমূহে এই ‘নিঃসঙ্গ’ প্রভাব কতটা পড়বে সময়ই তা বলে দেবে।

নিঃসঙ্গ শেরপা’র মতো তিনি নিঃসঙ্গ সারথি ছিলেন। প্রথম নিঃসঙ্গ হন ১৯৭১ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে তার স্বামী মেজর জিয়াউর রহমান, তাকে ও তাঁর দুই সন্তানকে ‘অকূল পাথারে’ ফেলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘যুদ্ধে’ গিয়েছিলেন। দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে তিনি সীমাহীন বিপদে পড়েছিলেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৬।

নিয়তি এই যে, দশ বছর পরে ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। নিঃসঙ্গতার শাড়ি চিরস্থায়ী হয়ে যায় তখন। রাজনৈতিক বাস্তবতা ২০১০ থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল।

নিঃসঙ্গতার সাথে সাথে বন্ধুত্বহীন জীবনের শুরু ১৯৮২ থেকে। লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের মৃত্যু ও এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর বিএনপি থেকে জাতীয় পার্টিতে যাওয়ার হিড়িক পড়েছিল তখন। বিএনপির সিনিয়র নেতারা, যারা এসেছিলেন অন্যদল থেকে, তারা আবারও ক্ষমতার হালুয়া রুটির লোভে পড়েছিলেন, বুঝতে পারেননি ততদিনে যে একা পথ চলার অভ্যাস হয়ে গেছে খালেদা জিয়ার!

এরশাদ বিরোধিতায় তিনি ক্রমশঃ হয়ে উঠেছিলেন ‘আপসহীন’। এই আপসহীনতার বাঁশি রাজপথে টেনে এনেছিল ছাত্রদের। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত বাংলাদেশের কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জয়জয়াকার। নির্বাচনেও জিততো তারা। এই জয়জয়াকারই ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এনেছিল বিএনপিকে। তখন তাঁর বয়স ৪৬। তিনি বাংলাদেশের সবচাইতে নিরপেক্ষ নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর কী তিনি বদলে গিয়েছিলেন? অনাগত সময় সেই বিচার করবে।

স্মৃতি নিয়েও একা থাকতে থাকতে পারেননি দীর্ঘদিন। ২০০৯ থেকেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে জেনারেল জিয়ার বাসভবন, জিয়ার মৃত্যুর পরে যেটা দেওয়া হয়েছিল তাঁর পরিবারকে, সেখান থেকে তার ভাষায় ‘এক কাপড়ে’ উচ্ছেদ করা হয় ২০১০ এর ১০ সেপ্টেম্বর। আক্ষেপ করে বলেছিলেন-‘এখন থেকে আমি বাস্তুহারা’! পয়ষট্টি বছর বয়সে দীর্ঘশ্বাস ও চোখের জলে আরেকবার নিঃসঙ্গ হয়েছিলেন তিনি।

রাজনীতি নিয়ে অনেক প্রবাদের একটা হচ্ছে এমন-‘দেশের জন্য মিছিলে নামে অনেকেই। ক্ষমতার বাতাস এরপর অনেককেই দূষিত করে তোলে।‘ ১৯৯৪ খেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ এর পুরোটা সময় তিনি এমন বৈরী বাতাসের মুখোমুখি হয়েছিলেন। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচনে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রথম বিতর্কের মুখে পড়েছিল তার আমলেই। দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, সার নিয়ে আন্দোলন ও পুলিশের গুলিতে কৃষকদের মৃত্যু, ইয়াসমীন হত্যা ও ধর্ষণ, ১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচন, বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো, সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা, আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা, বাংলা ভাই শায়খ আব্দুর রহমান তথা উগ্রবাদীদের উত্থানে তাঁর প্রতি সমালোচনা তীব্র হয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় দেরি ও  ‘আপসহীন নীরবতা’র কারণেই এমন হয়েছিল কিনা সেই প্রশ্ন বিদায় বেলায় আর না তুলি।

মুচলেকা দিয়ে (সম্ভবত) তারেক রহমান দেশ ছাড়েন ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির আগে মা ও ছেলের আর দেখা হয়নি। দশ বছর আগের আরেক জানুয়ারিতে (২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ) আরাফাত রহমান কোকো মারা যান মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। মৃত্যকালে কোকোর সাথে তারেক রহমানের দেখা হয়নি। খালেদা জিয়ার কান্নায় মন ভেঙ্গে দিয়েছিল ভক্ত সমর্থকদের। নিঃসঙ্গতাই তাকে আপন করে নিয়েছে ক্রমশঃ।

এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে তিন তিনবার আটক করা হলেও কারাগারে নেয়া হয়নি খালেদা জিয়াকে। তাঁর প্রথমবার কারাবাসের অীভজ্ঞতা হয় ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা মঈনুদ্দীন ফখরুদ্দীনের আমলে। এক বছর আট দিন পরে ২০০৮ এর সেপ্টেম্বরে তিনি মুক্ত হন যদিও প্রচলিত কারাগারে তাঁকে থাকতে হয়নি। তাঁর ও শেখ হাসিনার জন্য আলাদা সাবজেল তৈরি করা হয়েছিল। জেলে থাকা অবস্থাতেই তাঁর বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এই মামলায় ২০১৮ সালের আট ফেব্রুয়ারি তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। তাকে রাখা হয়েছিল পুরোনো ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডের কারাগারে যেটি তখন আর কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল না। এবারও তাঁকে প্রচলিত কারাগারে যেতে হয়নি কিন্তু পুরোনো বা পরিত্যক্ত জেলে তিনি একরকম একাই ছিলেন, যদিও এক সহকারি ছিল তাঁর দেখভালের জন্য। সম্ভবত নিঃসঙ্গতাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও লে.জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের পর এদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। জুলাই জাগরনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়েছে, শেখ হাসিনা সহ সরকার সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ মানুষ পালিয়েছেন। খালেদা জিয়া তার নীরবতা বা কম কথা বলার কারণে আরও বেশি জনগণ প্রিয় হয়েছেন। হয়তো দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য করেছেন তিনি।

একই সাথে রাজনীতি আবেগের জায়গা হলেও সেখানে বিরোধী মতের অস্তিত্বও প্রবল থাকে। তবু সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্র এবং শালীন মানুষের প্রতিকৃতি।

আগেই লিখেছি রাষ্ট্রের জন্যও কেউ অপরিহার্য নন। তবু বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনসমূহ এমনকি বাংলাদেশ তাঁকে হারিয়ে নিঃসঙ্গতায় ভুগবে!

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার জানাজায় লাখো মানুষ সমবেত হয়েছিলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়ী জানাযায় সেই রেকর্ড নিঃসন্দেহে ভেঙ্গে যাবে। সারাদেশে জাকিয়ে বসা শীত মানুষের চোখের জলে ভেসে যাবে..

নিঃসঙ্গ জীবন থেকে তিনি চলে গেলেন চির নিঃসঙ্গতায়। এর আগে গিয়েছেন তাঁর প্রিয়তম স্বামী, আদরের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো, পরবাসে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান। তারেক ফিরেছেন। বাবার অনুপস্থিতিতে ছায়া হয়ে থাকা প্রিয়তম মায়ের ছায়াটাও আর থাকলো না। হয়তো তাকেও নিঃসঙ্গ পথেই হাঁটতে হবে।

বিদায় বেগম খালেদা জিয়া। চলে গিয়েও কেউ কেউ থেকে যান মানুষের হৃদয়ে, প্রবলভাবে। বারবার বলেছেন বিদেশে তাঁর কোনও ঠিকানা নেই। বাংলার মাটিই তাঁর ঠিকানা। এই ঠিকানাতেই তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। আপামর একজন ভদ্র মানুষের প্রতিকৃতি, যাকে নিয়ে কোনও দুর্নীতির সত্য অভিযোগ নেই, তিনি যেন ছিলেন বাংলার মানুষের মা হয়ে।

শতাব্দীর দেয়ালে তাঁর নাম লেখা হয়ে গেছে খোদাই করে। বাংলাদেশ তাঁকে ভুলবে না।

লেখক: রম্যলেখক