মব সন্ত্রাসে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, আর চলতি বছরটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক অধ্যায় হয়ে উঠেছে। আগের বছরগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটলেও ২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স দেশজুড়ে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা—কোনো এলাকাই এই সহিংসতা থেকে মুক্ত থাকেনি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১৮৪ জন মব সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ডিসেম্বর মাসের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকলেও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে আরও অন্তত ১২ জন গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরে মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে অন্তত ১৯৬ জনে। এই সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও মব সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
আসকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছরে দেশে মব ভায়োলেন্সে মোট ৪২৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে নিহত হন ২৮ জন, ২০২২ সালে ৩৬ জন, ২০২৩ সালে ৫১ জন, ২০২৪ সালে ১২৮ জন এবং শুধু চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে মব সন্ত্রাসের মাত্রা প্রায় সাত গুণ বেড়েছে।
ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বেশি নিহতের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে—পাঁচ বছরে মোট ১৯০টি, যার মধ্যে চলতি বছরের ১১ মাসেই ৭৮টি। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে নিহতের সংখ্যা ৮০ জন। সবচেয়ে কম ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে নিহত হয়েছেন ১৫ জন। চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অপহরণ, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা কটূক্তির অভিযোগ তুলে এসব গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সহিংসতা থামানো কঠিন। অন্যথায় চলতি বছরের মতো আতঙ্ক ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মব ভায়োলেন্স বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পূর্ণ সক্ষমতায় ঘুরে দাঁড়াতে না পারা এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার ঘাটতি। অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে—অপরাধ করলেও শাস্তি নিশ্চিত হয় না। ফলে মানুষ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিতে আগ্রহী হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের দ্রুত বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। একটি পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তেই জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত শত্রুতা, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও দলগত মানসিকতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ভিড়ের মধ্যে মানুষ ব্যক্তিগত বিবেচনা হারিয়ে ফেলে। অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের সহনশীলতাও কমিয়ে দিয়েছে, যা মব সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বিশৃঙ্খল জনতা যখন আইনের আশ্রয় না নিয়ে নিজেরাই বিচার করতে নামে, সেটিই মব জাস্টিস। সামাজিক অস্থিরতা, আইনের শাসনের দুর্বলতা, রাজনৈতিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার এবং পরিকল্পিতভাবে কাউকে ফাঁসানোর প্রবণতাও এই সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।
চলতি বছর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বহু গণপিটুনির ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোথাও ছিনতাইয়ের অভিযোগে, কোথাও চোর সন্দেহে পথচারীদের মারধর করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকা, অফিস-আদালত, বাস টার্মিনাল, কাঁচাবাজার ও ব্যস্ত মোড়ে এসব ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটেছে। একই চিত্র দেখা গেছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও।
কিছু ঘটনায় ধর্মীয় অনুভূতি ও গুজব ভয়াবহ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় ইস্যুতে গুজব ছড়ালে মানুষ দ্রুত উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। এর উদাহরণ হিসেবে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় এক পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা আলোচিত হয়েছে, যদিও র্যাব জানিয়েছে, সেখানে ধর্ম অবমাননার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছরে গণপিটুনি তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেক সময় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও উত্তপ্ত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও আবার দেরিতে পৌঁছানোর কারণে প্রাণহানি ঘটে। সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো চলতি বছরের গণপিটুনির ঘটনাগুলোকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের হাতে থাকা উচিত, কোনোভাবেই জনতার হাতে নয়।
পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে, তবে পুলিশের একার পক্ষে এটি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়; এ জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, মব সন্ত্রাসে জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আর অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মতে, মব সহিংসতা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, দুর্বল করছে সামাজিক বন্ধন। তাই আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
রিপোর্টারের নাম 

























