দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে পেপ্যাল (PayPal) অবশেষে শীঘ্রই বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই খবরটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পেপ্যাল চালু হলে দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (SMEs) এবং ফ্রিল্যান্সাররা সহজে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের দীর্ঘদিনের লেনদেন সংক্রান্ত জটিলতা দূর করবে।
🌐 পেপ্যাল কী এবং এর কার্যক্রম
পেপ্যাল হলো একটি আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি, যা আর্থিক সেবা প্রদান করে। এটি একটি বিশ্বস্ত অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অনলাইনে টাকা পাঠানো, গ্রহণ করা, বিল পরিশোধ করা এবং আন্তর্জাতিক কেনাকাটা করতে পারেন।
- বিশ্বব্যাপী ব্যবহার: পেপ্যাল বিশ্বের দুই শতাধিক দেশে ব্যবহৃত হয় এবং এর ব্যবহারকারী সংখ্যা ৩৬০ মিলিয়নেরও বেশি।
- ইতিহাস: এটি ১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করে এবং চিরাচরিত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার, চেক বা ওয়্যার ট্রান্সফারের ভোগান্তি দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
- কার্যপ্রণালী: পেপ্যাল মূলত ব্যাংক ও মার্চেন্টের (Merchant) মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। ব্যবহারকারীরা বিনামূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড যুক্ত করে সুরক্ষিত উপায়ে লেনদেন করতে পারেন।
- চার্জ ও অ্যাকাউন্ট: বন্ধু বা পরিবারকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো চার্জ লাগে না, তবে কেনাকাটা বা সার্ভিসের জন্য একটি ছোট অঙ্কের ফি দিতে হয়। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সাধারণ অ্যাকাউন্ট এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য পেপ্যাল বিজনেস অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়।
✨ পেপ্যালের বিশেষ ফিচার
পেপ্যালের দুটি উল্লেখযোগ্য বিশেষ ফিচার রয়েছে:
- পেপ্যাল ক্রেডিট (PayPal Credit): এটি পেপ্যাল-চালিত একটি ওপেন-এন্ড ক্রেডিট সার্ভিস অ্যাকাউন্ট, যা ভার্চুয়াল ক্রেডিট কার্ডের মতো কাজ করে। এটি শুধু সেসব স্থানে ব্যবহার করা যায় যেখানে পেমেন্ট মেথড হিসেবে পেপ্যাল ক্রেডিট সাপোর্ট করে।
- পেপ্যাল ক্যাশ (PayPal Cash): পেপ্যালে থাকা সব অর্থকে একত্রে পেপ্যাল ক্যাশ বলা হয়। ব্যবহারকারীরা এই অর্থ ক্যাশ অ্যাকাউন্টে রাখতে পারেন অথবা ব্যাংকে ট্রান্সফার করতে পারেন। এই ক্যাশ ব্যালেন্স সরাসরি পরিবার বা বন্ধুদের পাঠানো যায় এবং গুগল পে ও স্যামসাং পের মতো পেমেন্ট সার্ভিস থেকেও এটি ব্যবহার করা যায়।
📈 পেপ্যাল চালু হলে ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাদের সুবিধা
বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু হলে ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা এবং ই-কমার্স খাতে নিম্নলিখিত বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে:
- দ্রুত ও সহজ পেমেন্ট: আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক দ্রুত ও সহজে গ্রহণ করা যাবে, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অধিক বিশ্বস্ত।
- ফ্রিল্যান্সারদের সুবিধা: ফ্রিল্যান্সাররা আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ও সরাসরি ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে নিরাপদে পেমেন্ট নিতে পারবেন, ফলে তাদের কাজের সুযোগ ও আয় বাড়বে।
- বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন: দেশে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসবে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
- ই-কমার্স ও স্টার্টআপ: দেশীয় স্টার্টআপ ও ই-কমার্স খাতের আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এলসি (Letter of Credit) খোলার জটিলতা কমবে।
- নিরাপত্তা: গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নিরাপত্তা, পারচেজ প্রটেকশন (Purchase Protection) এবং ট্রানজেকশনের সুরক্ষা পেপালের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।
⏳ পেপ্যাল চালুর দীর্ঘসূত্রিতা ও বর্তমান অবস্থা
অতীতে বিভিন্ন সময়ে পেপ্যাল বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বারবার স্থগিত হয়েছে। বিশেষ করে, ২০১৭ সালে একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত আন্তর্জাতিক লেনদেনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
বর্তমানে পেপ্যালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জুম’ (Xoom) সীমিত আকারে সেবা দিলেও, তা ফ্রিল্যান্সারদের মূল চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস ও সরাসরি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে পেমেন্ট গ্রহণের জন্য পেপ্যালের সম্পূর্ণ পরিষেবা অপরিহার্য। তাই সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে পেপ্যাল চালুর ঘোষণা আসার পরও, ফ্রিল্যান্সিং খাত এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিষেবার জন্য অপেক্ষা করছে।
এই তথ্যটি ‘অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর জানান।
💵 নগদ লেনদেন কমানোর ওপর গুরুত্ব
পেপ্যাল চালুর ঘোষণার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নগদ লেনদেন কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, দেশে দুর্নীতির মূলে রয়েছে নগদ টাকার লেনদেন। এছাড়া, টাকা ছাপানো ও ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধাপে ধাপে নগদ লেনদেন কমানোর পরিকল্পনা করছে। গভর্নর আরও বলেন, কৃষি খাতে ঋণের পরিমাণ বর্তমানে মাত্র ২ শতাংশ, যা বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন।
রিপোর্টারের নাম 

























