বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্ম বা পোশাকের পরিবর্তন নিয়ে বর্তমানে এক জটিল ও অমীমাংসিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, পুলিশ বাহিনীর ৯০ শতাংশের বেশি সদস্য আওয়ামী লীগ শাসনামলের সেই পরিচিত পোশাকেই ফিরে যাওয়ার পক্ষে তাদের জোরালো মতামত ব্যক্ত করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তর ইতোমধ্যে দেশের সবকটি ইউনিট থেকে সদস্যদের এই মতামত সংগ্রহ করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি এবং ওই পোশাকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘রক্তের দাগ’ নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় সরকার ও মন্ত্রণালয় এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে পুলিশের নতুন পোশাক নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
এই পোশাক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটটি বেশ দীর্ঘ ও বিতর্কিত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ভূমিকা ও তাদের ইউনিফর্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচিত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পোশাকের রঙ ও ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নতুন পোশাকের রঙ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি খোদ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও চরম অসন্তুষ্টি ও ‘হীনম্মন্যতা’ তৈরি হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই দাবিটি পুনরায় সামনে আসে। পুলিশ সদস্যদের মতে, জুলাই-পূর্ববর্তী নীল-জলপাই মিশ্রিত সাবেক পোশাকেই তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং এটি বাহিনীর পেশাদার আভিজাত্যের প্রতীক। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী আমলের পোশাকটি সদস্যদের মনোবল কমিয়ে দিয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে রাজনৈতিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তাদের আশঙ্কা, আগের পোশাকে ফিরে গেলে জুলাই অভ্যুত্থানের দুঃসহ স্মৃতি নতুন করে উসকে উঠতে পারে, যা বিরোধীদের হাতে সরকারের বিরুদ্ধে বড় কোনো ইস্যু তুলে দিতে পারে। আবার বর্তমান পোশাকটি সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় পুলিশ বাহিনীতে এক ধরনের ‘পরিচয় সংকট’ ও অস্বস্তি বিরাজ করছে। এই দোদুল্যমানতা কাটাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আধুনিকায়ন ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে লাইট গ্রে বা নেভি ব্লু রঙের ব্যবহার এবং গরম আবহাওয়ার উপযোগী আধুনিক ও আরামদায়ক ‘রিপস্টপ’ কাপড়ের প্রচলন। এছাড়া ভুয়া পুলিশ শনাক্তে কিউআর কোড সংবলিত নেমপ্লেট ও বডি ক্যামেরার মতো আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজনও আলোচনায় রয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা চললেও বিষয়টি বর্তমানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। একদিকে বাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও ঐতিহ্যে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পুলিশের ইউনিফর্ম নিয়ে এই অনিশ্চয়তা কতদিন স্থায়ী হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য এমন একটি পোশাক নিশ্চিত করা, যা কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের ছাপমুক্ত থেকে পেশাদারিত্বের নতুন পরিচয় বহন করবে।
রিপোর্টারের নাম 




















