ঢাকা ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

বৈশ্বিক চোকপয়েন্ট সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: আমদানি নির্ভরতায় চরম ঝুঁকির সতর্কতা

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার হামলা-পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিরাজমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই৩জি (E3G) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালির মতো সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বারবার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যারা তেল ও এলএনজি আমদানির ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই সামুদ্রিক পথগুলো সাময়িক কোনো বাধা নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদী ও ঘন ঘন ঘটা ঝুঁকি। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকলেও এই সরু জলপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তাহীনতা সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্থবির করে দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে শুধু একমুখী নয়, বরং বহুমাত্রিক ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছে। স্বল্পমেয়াদে এই ধরনের বড় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় যেকোনো সামান্য বিঘ্নও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে ‘পেপার চোকপয়েন্ট’ বা নথিপত্র সংক্রান্ত বাধার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াও জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা, বিমা সুবিধা প্রত্যাহার কিংবা নীতিগত জটিলতার কারণেও জ্বালানি বাজার দ্রুত অস্থির হয়ে উঠতে পারে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

ই৩জির জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির প্রধান মারিয়া পোস্তুকোভা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ এই চোকপয়েন্ট ঝুঁকির একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে। তার মতে, শুধু বর্তমানের হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা সামাল দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও অনেক সংকট আসবে। তাই দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যাপক বিদ্যুতায়ন এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া এখন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

ই৩জির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোই এই চোকপয়েন্ট সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ায় আসে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি কারণ এখানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারের সামান্য ওঠানামাও স্থানীয় বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। গ্লোবাল ক্লিন পাওয়ার ডিপ্লোম্যাসির পলিসি অ্যাডভাইজার রিনো সুগিওকা পরামর্শ দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের জন্য এখন নতুন করে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের দিকে না ঝুঁকে বরং চাহিদা কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া উচিত।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ এবং গ্রিড আধুনিকীকরণের মাধ্যমে দ্রুত ঝুঁকি কমানো সম্ভব, তবে এর জন্য স্বল্প সুদে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমানোর মতো বড় উদ্যোগগুলো নতুন সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিতে হবে। ই৩জি সতর্ক করেছে যে, স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে নতুন কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প গ্রহণ করলে তা দেশের কাঠামোগত দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে; তাই চোকপয়েন্ট নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে একমাত্র টেকসই সমাধান।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

বৈশ্বিক চোকপয়েন্ট সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: আমদানি নির্ভরতায় চরম ঝুঁকির সতর্কতা

আপডেট সময় : ১২:০১:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার হামলা-পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিরাজমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই৩জি (E3G) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষ করে বিশ্ব বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালির মতো সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বারবার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যারা তেল ও এলএনজি আমদানির ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই সামুদ্রিক পথগুলো সাময়িক কোনো বাধা নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদী ও ঘন ঘন ঘটা ঝুঁকি। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকলেও এই সরু জলপথগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা নিরাপত্তাহীনতা সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্থবির করে দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে শুধু একমুখী নয়, বরং বহুমাত্রিক ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছে। স্বল্পমেয়াদে এই ধরনের বড় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় যেকোনো সামান্য বিঘ্নও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে ‘পেপার চোকপয়েন্ট’ বা নথিপত্র সংক্রান্ত বাধার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াও জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা, বিমা সুবিধা প্রত্যাহার কিংবা নীতিগত জটিলতার কারণেও জ্বালানি বাজার দ্রুত অস্থির হয়ে উঠতে পারে, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

ই৩জির জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির প্রধান মারিয়া পোস্তুকোভা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ এই চোকপয়েন্ট ঝুঁকির একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে। তার মতে, শুধু বর্তমানের হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা সামাল দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও অনেক সংকট আসবে। তাই দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যাপক বিদ্যুতায়ন এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া এখন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

ই৩জির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এশিয়ার দেশগুলোই এই চোকপয়েন্ট সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেল ও এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ায় আসে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি কারণ এখানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কম এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারের সামান্য ওঠানামাও স্থানীয় বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। গ্লোবাল ক্লিন পাওয়ার ডিপ্লোম্যাসির পলিসি অ্যাডভাইজার রিনো সুগিওকা পরামর্শ দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের জন্য এখন নতুন করে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের দিকে না ঝুঁকে বরং চাহিদা কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া উচিত।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ এবং গ্রিড আধুনিকীকরণের মাধ্যমে দ্রুত ঝুঁকি কমানো সম্ভব, তবে এর জন্য স্বল্প সুদে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমানোর মতো বড় উদ্যোগগুলো নতুন সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিতে হবে। ই৩জি সতর্ক করেছে যে, স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে নতুন কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প গ্রহণ করলে তা দেশের কাঠামোগত দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে; তাই চোকপয়েন্ট নির্ভরতা কমিয়ে একটি শক্তিশালী নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে একমাত্র টেকসই সমাধান।