মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত এবং এর স্থায়িত্ব নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন; দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রতিদিন যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক ও বিক্রেতাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার বড় অংশই ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল।
বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগের জন্যই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ সক্ষমতা অনুযায়ী পুরো বছরের চাহিদা একবারে মজুত করার সুযোগ নেই, বরং এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়ায় চলে। বৈশ্বিক সংকটের আশঙ্কায় গত মার্চ মাস থেকেই জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং বা সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে সরকার এবং দাবি করা হয়েছে যে মার্চের মতো এপ্রিল মাসেও কোনো বড় সংকট হবে না।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে। এছাড়া ৭ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুত আছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে, দেশে ডিজেলের দৈনিক গড় চাহিদা ১২ হাজার মেট্রিক টন, সেই হিসেবে বর্তমানে মজুত থাকা ডিজেলে প্রায় ১১ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে এর অর্থ এই নয় যে মজুত শূন্য হয়ে যাবে, কারণ নিয়মিত বিরতিতে নতুন আমদানিকৃত তেলের চালান দেশে পৌঁছাচ্ছে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার বর্তমানে মাসভিত্তিক চাহিদা পূরণে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং গত বছরের এপ্রিলের সমপরিমাণ সরবরাহ এবারও নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও জানান যে ডিজেলে কোনো প্রকৃত সংকট নেই, তবে পাচারের শঙ্কা থাকায় সীমান্ত এলাকায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পেট্রোল পাম্পের সামনের দীর্ঘ লাইনকে তিনি ‘মনস্তাত্ত্বিক’ সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা উচিত হলেও বাংলাদেশের সংরক্ষণ সক্ষমতা কম হওয়ায় ৩০ থেকে ৪০ দিনের বেশি তেল মজুত রাখা সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম। তিনি মনে করেন, ‘কৌশলগত মজুদের’ এই সক্ষমতাহীনতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। এদিকে মাঠ পর্যায়ে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে; ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্রাহকরা কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না, আবার পেট্রোল পাম্প মালিকরা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে রাতে তেল বিক্রি বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতিমধ্যে সারাদেশে ১ হাজার ৫ শর বেশি ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়েছে যারা ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরাসরি তদারকি করছেন। গত ৩০ মার্চ একদিনেই সারাদেশে ৩৯১টি অভিযানে ১৯১টি মামলা ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ মজুতকৃত জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, ভারত ও সিঙ্গাপুরের সাথে বিদ্যমান চুক্তির পাশাপাশি আমেরিকা ও চীনের সাথেও বিকল্প উপায়ে জ্বালানি তেল আনার বিষয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























