দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘বাংলাদেশ সনদ’ নামক একটি নতুন রূপরেখা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সনদের ডিজিটাল ফরম ছেড়ে সদস্য আহ্বান করার পর থেকেই বিষয়টি টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে এবং ইতোমধ্যে তাদের ফেসবুক পেজে অনুসারীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এই সনদের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার, জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন এটি কি বর্তমান সংবিধানের কোনো বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে চায় নাকি এর পরিপূরক কোনো দলিল হিসেবে কাজ করবে।
প্রস্তাবিত এই সনদে আটটি বিশেষ অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে একাত্তরের গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ, জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ন্যায়পরায়ণতা, গণতন্ত্র ও সুশাসন। উদ্যোক্তাদের দাবি এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার দলিল এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়তেই তাদের এই উদ্যোগ। এই প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা মহিউদ্দিন ফারাহ ও আরিফুজ্জামান নাঈম ফেসবুক লাইভে জানিয়েছেন যে তারা একাত্তরের স্বাধীনতার চেতনা থেকেই এই কার্যক্রম শুরু করেছেন এবং এটি কোনো সংবিধানের বিকল্প নয় বরং কেমন বাংলাদেশ চাই তার একটি যৌথ অবস্থান। তারা একে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছেন যেখানে স্বাধীনতার মূল চেতনা এবং সংবিধানের আদর্শকে নতুনভাবে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে এই সনদের নেপথ্যে কারা রয়েছেন এবং তাদের আসল উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও ধোঁয়াশা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ এই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করে বলেন যে বিগত দিনে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিক্রি করেছে আর এখন জুলাইকে পুঁজি করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি চলছে এবং এর মাঝেই ‘বাংলাদেশ সনদ’ নাম দিয়ে আরেকটি শক্তি সামনে আসার চেষ্টা করছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও আট দফা অঙ্গীকারে বাহাত্তরের মূলনীতির কথা কেন উল্লেখ করেনি।
এছাড়া জামায়াত যেমন একাত্তরের গণহত্যার জন্য দায়ী তেমনই আওয়ামী লীগও জুলাই গণহত্যার জন্য দায়ী কিন্তু এই সনদের উদ্যোক্তারা জুলাই গণহত্যার বিষয়ে কেন নীরব তা নিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব একে আওয়ামী লীগের একটি ছদ্মবেশী তৎপরতা হিসেবে দেখছেন এবং অভিযোগ করছেন যে সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হতে না পেরে একটি গোষ্ঠী দিল্লির পক্ষে ভূমিকা রাখতে ভিন্ন নামে এই সনদ নিয়ে সামনে আসার চেষ্টা করছে। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিমও এই উদ্যোগের স্বচ্ছতা ও প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ঠিক কী বোঝাতে চায় তার ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যেও এই সনদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্যারিস্টার ও সলিজিটর নিঝুম মজুমদার তার ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন যে এই সনদে বাহাত্তরের সংবিধানের সমাজতন্ত্রসহ মৌলিক স্তম্ভ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা জাতীয় চার নেতার স্পষ্ট ইতিহাসের অনুপস্থিতি বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে আরিফ জেবতিক একে ৫ আগস্ট পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যে একটি যৌথ অবস্থানের ধারণা হিসেবে দেখছেন যা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তা স্পষ্ট করতে সহায়ক হতে পারে।
উদ্যোক্তারা সদস্য ফরমে উল্লেখ করেছেন যে কেউ এই বিষয়ের সঙ্গে একমত হলে স্বাক্ষর করতে পারেন অথবা নিজের ভিন্ন মতামত লিখে জানাতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এই ‘বাংলাদেশ সনদ’ কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটাতে পারবে কি না তা নির্ভর করছে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ওপর। তবে বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের তৎপরতা নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেয় কি না তা নিয়ে পর্যবেক্ষক মহল সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন।
রিপোর্টারের নাম 
























