ঢাকা ১০:০৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ফেসবুকের ভয়াবহ অপব্যবহার: ‘সন্ত্রাসী গ্রুপ’ ফাঁদে সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্টদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয়

ফেসবুকের রিপোর্টিং সিস্টেমের একটি মারাত্মক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো পরিকল্পিতভাবে নিষ্ক্রিয় বা ডিজএবল করে দিচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রটি সুনির্দিষ্ট টার্গেটকে ‘আইএস’ বা ‘আল-কায়েদা’-এর মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে তৈরি করা মেসেঞ্জার গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত করছে এবং পরে সেটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে রিপোর্ট করে সফলভাবে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে সক্ষম হচ্ছে।

এই কৌশলটি নতুন হলেও এর কার্যকারিতা ভয়াবহ। একাধিক ভুক্তভোগী ব্যবহারকারী এবং সম্প্রতি আক্রান্ত একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধানে এই ‘ফাঁদ’ পাতার কৌশলটির সত্যতা মিলেছে।

🚨যেভাবে কাজ করছে নতুন ‘ডিজএবল’ কৌশল

এই আক্রমণ কৌশলটি মূলত ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় মডারেশন (Automated Moderation) সিস্টেমকে বোকা বানিয়ে কাজ করছে। কৌশলটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

ধাপপ্রক্রিয়ালক্ষ্য
১. বার্তা প্রেরণচক্রের সদস্যরা প্রথমে টার্গেট অ্যাকাউন্টে একটি সাধারণ বার্তা বা মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠায়।টার্গেটকে উত্তর দিতে উৎসাহিত করা।
২. গ্রুপ তৈরিটার্গেট উত্তর দেওয়ার সাথে সাথেই (অথবা কিছু ক্ষেত্রে উত্তর না দিলেও), আক্রমণকারী সেই কথোপকথনে আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট যোগ করে একটি গ্রুপ চ্যাট তৈরি করে।টার্গেটকে ফাঁদে ফেলা।
৩. গ্রুপ নামকরণএই গ্রুপ চ্যাটগুলোর নাম দেওয়া হয় পরিচিত সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে (যেমন: আইএস, আল-কায়েদা, ইত্যাদি)।ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় মডারেশন সিস্টেমকে ট্রিগার করা।
৪. মিথ্যা রিপোর্টগ্রুপ তৈরির পরপরই চক্রের সদস্যরা সম্পূর্ণ গ্রুপ চ্যাটটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ (Terrorism) হিসেবে ফেসবুকের কাছে মিথ্যা রিপোর্ট করে।টার্গেট অ্যাকাউন্টটিকে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনের দায়ে দ্রুত ডিজএবল করে দেওয়া।

গ্রুপের নামে সন্ত্রাসী সংগঠনের উল্লেখ এবং একাধিক রিপোর্ট পাওয়ায় ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম দ্রুত সেই গ্রুপে থাকা টার্গেট অ্যাকাউন্টটিকে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনের দায়ে ডিজএবল করে দিচ্ছে।

🚨কেন সাংবাদিকরা বেশি ঝুঁকিতে?

এই কৌশলটি মূলত সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের টার্গেট করছে, কারণ তাঁদের কাজের প্রকৃতি এই আক্রমণের জন্য অনুকূল। পেশাগত কারণেই তাঁদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য বা টিপস পেতে ‘সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মেসেজ পাবার’ (Message requests from everyone) সেটিংসটি চালু রাখতে হয়। অসাধু চক্রটি ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে প্রথমে সাধারণ মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে।

অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার উপায়

এই ধরনের হঠকারী আক্রমণ থেকে আপাতত অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার জন্য বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন:

  • মেসেজ রিকোয়েস্ট বন্ধ: মেসেঞ্জারে সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মেসেজ পাবার’ সেটিংসটি (Message requests from everyone) সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত।
  • অপরিচিত মেসেজ এড়িয়ে চলা: মেসেঞ্জারের স্প্যাম ফোল্ডারে আসা বা সম্পূর্ণ অপরিচিত কারো পাঠানো মেসেজ যাচাই না করে ওপেন না করা বা সেগুলোর উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকা।

জানা গেছে, ফেসবুকের রিপোর্টিং সিস্টেমের এই গুরুতর দুর্বলতা এবং এর অপব্যবহারের বিষয়টি ইতোমধ্যে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান ‘মেটা’-এর যথাযথ টিমকে অবহিত করা হয়েছে এবং তারা এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শচীনকে ছাড়িয়ে কোহলির বিশ্বরেকর্ড, কিউইদের হারিয়ে শুভসূচনা ভারতের

ফেসবুকের ভয়াবহ অপব্যবহার: ‘সন্ত্রাসী গ্রুপ’ ফাঁদে সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্টদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয়

আপডেট সময় : ০১:৫৩:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

ফেসবুকের রিপোর্টিং সিস্টেমের একটি মারাত্মক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো পরিকল্পিতভাবে নিষ্ক্রিয় বা ডিজএবল করে দিচ্ছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রটি সুনির্দিষ্ট টার্গেটকে ‘আইএস’ বা ‘আল-কায়েদা’-এর মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে তৈরি করা মেসেঞ্জার গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত করছে এবং পরে সেটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে রিপোর্ট করে সফলভাবে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে সক্ষম হচ্ছে।

এই কৌশলটি নতুন হলেও এর কার্যকারিতা ভয়াবহ। একাধিক ভুক্তভোগী ব্যবহারকারী এবং সম্প্রতি আক্রান্ত একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধানে এই ‘ফাঁদ’ পাতার কৌশলটির সত্যতা মিলেছে।

🚨যেভাবে কাজ করছে নতুন ‘ডিজএবল’ কৌশল

এই আক্রমণ কৌশলটি মূলত ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় মডারেশন (Automated Moderation) সিস্টেমকে বোকা বানিয়ে কাজ করছে। কৌশলটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:

ধাপপ্রক্রিয়ালক্ষ্য
১. বার্তা প্রেরণচক্রের সদস্যরা প্রথমে টার্গেট অ্যাকাউন্টে একটি সাধারণ বার্তা বা মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠায়।টার্গেটকে উত্তর দিতে উৎসাহিত করা।
২. গ্রুপ তৈরিটার্গেট উত্তর দেওয়ার সাথে সাথেই (অথবা কিছু ক্ষেত্রে উত্তর না দিলেও), আক্রমণকারী সেই কথোপকথনে আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট যোগ করে একটি গ্রুপ চ্যাট তৈরি করে।টার্গেটকে ফাঁদে ফেলা।
৩. গ্রুপ নামকরণএই গ্রুপ চ্যাটগুলোর নাম দেওয়া হয় পরিচিত সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে (যেমন: আইএস, আল-কায়েদা, ইত্যাদি)।ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় মডারেশন সিস্টেমকে ট্রিগার করা।
৪. মিথ্যা রিপোর্টগ্রুপ তৈরির পরপরই চক্রের সদস্যরা সম্পূর্ণ গ্রুপ চ্যাটটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ (Terrorism) হিসেবে ফেসবুকের কাছে মিথ্যা রিপোর্ট করে।টার্গেট অ্যাকাউন্টটিকে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনের দায়ে দ্রুত ডিজএবল করে দেওয়া।

গ্রুপের নামে সন্ত্রাসী সংগঠনের উল্লেখ এবং একাধিক রিপোর্ট পাওয়ায় ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম দ্রুত সেই গ্রুপে থাকা টার্গেট অ্যাকাউন্টটিকে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনের দায়ে ডিজএবল করে দিচ্ছে।

🚨কেন সাংবাদিকরা বেশি ঝুঁকিতে?

এই কৌশলটি মূলত সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের টার্গেট করছে, কারণ তাঁদের কাজের প্রকৃতি এই আক্রমণের জন্য অনুকূল। পেশাগত কারণেই তাঁদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য বা টিপস পেতে ‘সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মেসেজ পাবার’ (Message requests from everyone) সেটিংসটি চালু রাখতে হয়। অসাধু চক্রটি ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়ে প্রথমে সাধারণ মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে।

অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার উপায়

এই ধরনের হঠকারী আক্রমণ থেকে আপাতত অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার জন্য বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন:

  • মেসেজ রিকোয়েস্ট বন্ধ: মেসেঞ্জারে সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মেসেজ পাবার’ সেটিংসটি (Message requests from everyone) সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা উচিত।
  • অপরিচিত মেসেজ এড়িয়ে চলা: মেসেঞ্জারের স্প্যাম ফোল্ডারে আসা বা সম্পূর্ণ অপরিচিত কারো পাঠানো মেসেজ যাচাই না করে ওপেন না করা বা সেগুলোর উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকা।

জানা গেছে, ফেসবুকের রিপোর্টিং সিস্টেমের এই গুরুতর দুর্বলতা এবং এর অপব্যবহারের বিষয়টি ইতোমধ্যে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান ‘মেটা’-এর যথাযথ টিমকে অবহিত করা হয়েছে এবং তারা এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।