২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ঘরমুখী মানুষের যাত্রা শুরুতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, শেষ মুহূর্তে এসে তা চরম ভোগান্তিতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও ময়মনসিংহমুখী যাত্রীদের জন্য এবারের ঈদযাত্রা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক যন্ত্রণার নাম। একদিকে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, অন্যদিকে পরিবহণ মালিকদের আকাশচুম্বী বাড়তি ভাড়া আদায়ের উৎসব—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।
ভাড়ার নৈরাজ্য: ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ
এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে বাসের বাড়তি ভাড়া নিয়ে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বারবার ‘বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না’ বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
- ভাড়া বৃদ্ধি: ২০০-৩০০ টাকার ভাড়া ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সময়ের তুলনায় ৪ গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছে যাত্রীদের।
- কৌশল: অনেক বাস মালিক কাউন্টার বন্ধ রেখে টার্মিনালের ভেতর থেকে গোপনে যাত্রী তুলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, এবারের ভাড়ার নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
- অভিযান: বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করলেও তা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেনি।
মহাসড়কে স্থবিরতা: উত্তরের পথে চরম দুর্ভোগ
বুধবার বিকেল থেকে পোশাক কারখানাগুলো একযোগে ছুটি হওয়ায় মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এর সাথে যোগ হয় ঝড়-বৃষ্টি এবং অব্যবস্থাপনা।
- চন্দ্রা ত্রিমোড়: ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকায় অন্তত ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। উল্টো পথে অটোরিকশা চলাচল এবং এলোমেলো পার্কিং এই জটলাকে আরও অসহনীয় করে তোলে।
- দীর্ঘ অপেক্ষা: উত্তরের জেলাগুলোতে পৌঁছাতে অনেক যাত্রীকে ২০ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বাসে কাটাতে হয়েছে। সঠিক সময়ে বাস না আসায় অনেককে খোলা ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে রওনা হতে দেখা গেছে।
রেল ও নৌপথের চিত্র
সড়কপথের তুলনায় নৌপথ কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও রেলপথে ছিল শিডিউল বিপর্যয়।
- রেলপথ: বগুড়ার সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় বৃহস্পতিবার উত্তরবঙ্গের ট্রেন চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। সকালের ট্রেন দুপুরে ছাড়ায় কমলাপুর স্টেশনে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ট্রেনের ভেতরে জায়গা না পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাজারো মানুষকে ছাদে চড়ে ভ্রমণ করতে দেখা গেছে।
- নৌপথ: সদরঘাটে ট্রলার ডুবির একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া লঞ্চ চলাচল ছিল মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে দক্ষিণাঞ্চলের বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ছিল।
দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি
ভোগান্তির এই যাত্রায় বেশ কিছু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবরও পাওয়া গেছে। বগুড়ায় মাইক্রোবাসে আগুন লেগে ৩ জন, রাজশাহীতে ট্রাক চাপায় বাবা-ছেলে এবং নওগাঁ ও চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। অতীতের তুলনায় প্রাণহানি কিছুটা কম হলেও ঘরমুখী মানুষের এই অকাল মৃত্যু উৎসবের আমেজকে বিষাদে পরিণত করেছে।
ঈদের এই শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি কমাতে এবং ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধে প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
রিপোর্টারের নাম 

























