ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর দেশের তৈরি পোশাক খাতে বেতন-বোনাস নিয়ে যে অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষের চিত্র দেখা যেত, ২০২৬ সালে তাতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। অতীতের অনিশ্চয়তা ও সড়ক অবরোধের বদলে এবার এই শিল্পে বিরাজ করছে এক অভাবনীয় স্বস্তির আবহ।
অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা সময়মতো তাদের পাওনা হাতে পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত সহায়তা, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের নগদ প্রণোদনা এবং মালিকপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্যে দেখা গেছে, এবার প্রায় শতভাগ কারখানায় বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) হিসাব অনুযায়ী, ৯৯.৯১ শতাংশ কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন এবং ৯৯.৮১ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৬৪ শতাংশ কারখানা মার্চ মাসের আংশিক বেতন অগ্রিম প্রদান করেছে, যা শ্রমিকদের কেনাকাটা ও গ্রামে ফেরার প্রস্তুতিকে সহজ করে তুলেছে।
এই রূপান্তরের মূলে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ কর্মসূচি। রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের পাওনা নিশ্চিত করতে সহজ শর্তে এই ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে।
এর ফলে অর্থ বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে এবং কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকেনি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সরবরাহ উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের স্বস্তি দিয়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন যে, বৈশ্বিক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার চাপ সত্ত্বেও সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে এবার শ্রমিক অসন্তোষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। অনেক মালিক নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ জোগান দিয়েও শ্রমিকের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন।
শ্রমিকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবার ধাপে ধাপে কারখানা ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় বুধবার নাগাদ প্রায় ৪৫ শতাংশ কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে পরিবহন সংকটের কারণে শ্রমিকদের যাতায়াতে কিছু ভোগান্তি এখনো রয়ে গেছে। স্বস্তির এই চিত্রের আড়ালে পোশাক খাত এখনো কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে; যেমন চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৩.৭৩ শতাংশ এবং জ্বালানি ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে সঠিক সময়ে নীতিগত সহায়তা দিলে বড় সংকট মোকাবিলা সম্ভব। তবে এই খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হলে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি। সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় পর দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের শ্রমিকরা একটি দুশ্চিন্তামুক্ত ও আনন্দময় ঈদ উদযাপনের সুযোগ পাচ্ছেন।
রিপোর্টারের নাম 

























