বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (ইউএনএইচআরসি) প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। ২৮ অক্টোবর পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মোমেন লিখেছেন, “গত এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটছে। দমন-পীড়ন, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবমাননা দেশে ভয়াবহ চিত্র তৈরি করেছে। জাতিসংঘের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং দুই দিন পর নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ রুদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করা হয়েছে।
চিঠিতে মোমেন আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, দলটির নিবন্ধন পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ পুনরুদ্ধারে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
এই চিঠি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্দোলন দমনে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঘোষণার অপেক্ষায়।
২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে টানা সাড়ে ১৫ বছর দেশ পরিচালনা করে আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। সে সময়ের সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হওয়ার তথ্য জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে আসে।
অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে ওই ঘটনাগুলোর বিচার করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করেছে। আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
মোমেন তার চিঠিতে ২৫ সামরিক কর্মকর্তার বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানান। তিনি বলেন, “এই মামলাগুলো অবশ্যই বেসামরিক আদালতে হওয়া উচিত, যাতে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা থাকে।” পাশাপাশি তিনি প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানান এবং অভিযোগ তোলা কর্মকর্তারা যেন প্রতিশোধমূলক নির্যাতনের শিকার না হন, সে বিষয়ে জাতিসংঘকে নজরদারি রাখার অনুরোধ করেন।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানি, নির্বিচারে আটক ও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্ত আলোচনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে মোমেন বলেন, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নাগরিক সমাজের তথ্যমতে, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর প্রায় ২,৪৪২টি সহিংসতা ঘটেছে। তিনি ইউইউএএর প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য এখনো “উচ্চমাত্রার ঝুঁকি” বিরাজ করছে।
জাতিসংঘের কাছে মোমেনের চার দফা আহ্বান
১। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি স্বাধীন তদন্ত বা তথ্য অনুসন্ধান মিশন গঠন করা।
২। ২৫ সেনা কর্মকর্তার মামলা বেসামরিক আদালতে স্থানান্তর করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
৩। বিনা বিচারে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়া।
৪। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যাতে আদালত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে।
চিঠির শেষাংশে মোমেন বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি রাজনৈতিক নয়, এটি এক মানবিক ও ন্যায়বিচার সংকট। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হচ্ছে, এই সংকটে বাংলাদেশকে সহায়তা করা।”
রিপোর্টারের নাম 
























