ঢাকা ১১:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

অর্থনীতির ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থনীতিবিদদের একগুচ্ছ পরামর্শ

## অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য অর্থনীতিবিদদের সুচিন্তিত পরামর্শ

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য চাপ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা মনে করেন, জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস অন্বেষণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং নীতি সুদহার আপাতত অপরিবর্তিত রাখাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে।

শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়োজনে এক বৈঠকে দেশের আটজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এই পরামর্শগুলো প্রদান করেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর গভর্নর নীতি সুদহার কমানোর একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তবে একজন সদস্যের পদত্যাগ এবং অর্থনীতিবিদদের আপত্তির মুখে সেই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়।

সম্প্রতি ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার সামরিক উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যের ক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। বিশেষ করে ডলারের ওপর চাপ বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক এবং বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত চাপ সম্পূর্ণভাবে এড়ানো কঠিন হলেও, এর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে এখনই সুচিন্তিত প্রস্তুতি গ্রহণ করা আবশ্যক। তাঁরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করে অতিরিক্ত আমদানি নিরুৎসাহিত করার পরামর্শ দেন। জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস খোঁজারও সুপারিশ করা হয়। বিশেষ করে ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার উপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা যেন তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে চাপিয়ে না দেওয়া হয়, সে বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন যে, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সরকারি বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সঠিক ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর তাঁরা জোর দেন। এছাড়া, বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ গ্রহণ এবং তেল আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবেলার জন্য, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশে আনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার সুপারিশও করা হয়েছে।

সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান তাঁর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না বলে জানান। একই সঙ্গে, ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশনা দেন তিনি।

অর্থনীতিবিদরা সবশেষে বলেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক বাজারের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে সুদের হার কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে আপাতত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁরা মনে করেন।

এছাড়াও, অর্থনীতিবিদরা একটি ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠনের পরামর্শ দেন। এই কমিটি বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিতভাবে ব্রিফ করবে, যাতে জনমনে কোনো প্রকার আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পটিয়ায় সংসদ সদস্য এনামকে সংযমী হতে বললেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক

অর্থনীতির ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থনীতিবিদদের একগুচ্ছ পরামর্শ

আপডেট সময় : ০৮:২৭:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

## অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য অর্থনীতিবিদদের সুচিন্তিত পরামর্শ

ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য চাপ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা মনে করেন, জ্বালানি আমদানির বিকল্প উৎস অন্বেষণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ এবং নীতি সুদহার আপাতত অপরিবর্তিত রাখাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে।

শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আয়োজনে এক বৈঠকে দেশের আটজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এই পরামর্শগুলো প্রদান করেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর গভর্নর নীতি সুদহার কমানোর একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তবে একজন সদস্যের পদত্যাগ এবং অর্থনীতিবিদদের আপত্তির মুখে সেই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়।

সম্প্রতি ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার সামরিক উত্তেজনা জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যের ক্ষেত্রে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। বিশেষ করে ডলারের ওপর চাপ বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক এবং বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত চাপ সম্পূর্ণভাবে এড়ানো কঠিন হলেও, এর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে এখনই সুচিন্তিত প্রস্তুতি গ্রহণ করা আবশ্যক। তাঁরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ করে অতিরিক্ত আমদানি নিরুৎসাহিত করার পরামর্শ দেন। জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস খোঁজারও সুপারিশ করা হয়। বিশেষ করে ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার উপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও তা যেন তাৎক্ষণিকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে চাপিয়ে না দেওয়া হয়, সে বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন যে, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সরকারি বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সঠিক ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর তাঁরা জোর দেন। এছাড়া, বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ গ্রহণ এবং তেল আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার সম্ভাব্য ধাক্কা মোকাবেলার জন্য, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশে আনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করার সুপারিশও করা হয়েছে।

সভায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান তাঁর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না বলে জানান। একই সঙ্গে, ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশনা দেন তিনি।

অর্থনীতিবিদরা সবশেষে বলেন যে, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক বাজারের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে সুদের হার কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে আপাতত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁরা মনে করেন।

এছাড়াও, অর্থনীতিবিদরা একটি ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ গঠনের পরামর্শ দেন। এই কমিটি বিভিন্ন সময়ে উদ্ভূত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিতভাবে ব্রিফ করবে, যাতে জনমনে কোনো প্রকার আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়।