ঢাকা ০৪:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

খেলাফত রাষ্ট্রে ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ (দ্বিতীয় পর্ব)

## ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবিচল সংগ্রাম: বনু হানিফায় ইকরিমা (রা.)-এর অভিযান

মদিনা: ইসলামের সোনালী ইতিহাসে ধর্মদ্রোহিতা দমনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল বনু হানিফা গোত্রের মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সৃষ্ট এই সংকট মোকাবিলায় খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দৃঢ় পদক্ষেপ এবং সাহাবিদের অদম্য সাহস এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই পর্বে আমরা বনু হানিফা গোত্রে ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

বনু হানিফায় ইমান ও কুফরের দ্বন্দ্ব:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করত। বনু হানিফা গোত্রও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাদের মধ্যে সুমামা ইবনে উসাল (রা.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহাবি। যদিও তিনি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আসেননি, বরং আলকুরতা যুদ্ধাভিযান থেকে ফেরার পথে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) তাকে বন্দি করে মদিনায় নিয়ে আসেন।

সুমামা ইবনে উসালের ইসলাম গ্রহণ ও মহানুভবতার শিক্ষা:

ইয়ামামার শাসক ও বনু হানিফার প্রধান সুমামা ইবনে উসাল (রা.) ছিলেন কুরাইশদের মিত্র এবং একসময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোর বিরোধী। মক্কায় উমরা করতে যাওয়ার পথে বন্দি হয়ে মদিনায় আসার পর তাকে মসজিদে নববির একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। প্রতিদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করতেন, “হে সুমামা, তোমার কী মনে হয়?” উত্তরে সুমামা বলতেন, “আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপর অনুগ্রহ করবেন। আর যদি সম্পদ চান, তবে যত ইচ্ছা চাইতে পারেন।” এই কথা শোনার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে কোনো শাস্তি দেননি।

কয়েক দিন ধরে মসজিদে অবস্থানকালে সুমামা (রা.) মুসলিমদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সৌজন্যবোধ, নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াত প্রত্যক্ষ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহনশীলতা ও মহানুভবতা কাছ থেকে দেখেন। বন্দি হওয়ার তিন দিন পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে কোনো শর্ত ছাড়াই তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি গোসল করে মসজিদে ফিরে আসেন এবং কালিমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসুলের দরবারে বনু হানিফার প্রতিনিধিদল ও মুসাইলামার উত্থান:

ইসলাম গ্রহণের পর সুমামা (রা.) নিজ গোত্রে ফিরে যান এবং বনু হানিফার একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদিনায় আসেন। প্রতিনিধিদলের সকলেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের উপহার দেন। প্রতিনিধিদল জানায়, তাদের উট ও আসবাবপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য একজন লোক বাইরে রয়ে গেছে – সে ছিল মুসাইলামা কাজ্জাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুপস্থিত মুসাইলামাকেও অন্যদের মতো উপহার দেন এবং তার প্রশংসা করে বলেন, সে আপনাদের মতোই মর্যাদার অধিকারী।

মদিনা থেকে ফিরে আসার পর মুসাইলামা ধর্মত্যাগ করে এবং নবুয়তের মিথ্যা দাবি তোলে। সে বলতে শুরু করে, “নবুয়তের বিষয়ে আমি ও মোহাম্মদ এক অন্যের অংশীদার।” সে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বলে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা “তোমাদের মুখে আমার কথা শুনে মোহাম্মদ বলেছিল, সে তোমাদের মতোই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তার এ কথা বলার মানে হলো নবুয়তের ক্ষেত্রে আমার অংশীদারত্ব মেনে নেওয়া।”

quando প্রতিনিধিদলের সদস্যরা তাকে মদিনায় গিয়ে রাসুলের হাতে বায়াত না নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে, মুসাইলামা উত্তর দেয়, “তিনি যদি পরবর্তী কর্তৃত্ব আমার হাতে সোপর্দ করতে সম্মত হন, তাহলেই আমি ইসলাম গ্রহণ করব।” এই কথা পেছন থেকে শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহর কসম, তুমি আমার কাছে এই সাধারণ কাঠখড়িটুকুও চাইলেও তোমাকে দেব না। আর আমি তোমার পরিণতি ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি, যেমনটি আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। তোমার সঙ্গে আমার পক্ষ থেকে সাবিত বিন কায়েস কথা বলবে।”

এরপর মুসাইলামা বনু হানিফায় ফিরে গিয়ে নিজেকে নবী দাবি করে এবং প্রচার করতে থাকে যে, নবুয়তের কার্যসমাধায় তাকে মুহাম্মদের অংশীদার করা হয়েছে। তার এই মিথ্যা দাবিতে বিভ্রান্ত হয়ে গোত্রের কিছু লোক তার প্রতি ঈমান আনে। নিজের নবুয়তের ভিত্তি মজবুত করার উদ্দেশ্যে সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বার্তা পাঠায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে হেদায়েতের আহ্বান জানালেও মুসাইলামা তার দূতকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

সংকটময় পরিস্থিতি ও খলিফা আবু বকরের দৃঢ় পদক্ষেপ:

নবীজি (সা.) মুসাইলামার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে সময় তিনি ফিলিস্তিন সীমান্তে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। এটা ছিল নবীজির ওফাতের অল্প সময় আগের ঘটনা। অধিকাংশ সাহাবি উসামার দলে অন্তর্ভুক্ত থাকায় তৎক্ষণাৎ হানিফা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান সম্ভব হয়নি। ততদিনে মুসাইলামার অনুসারী মুরতাদদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে যায়। নবীজি (সা.) দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা কোনো কিছু আমলে নিতে রাজি ছিল না।

ধীরে ধীরে মুসাইলামার দল ভারী হতে থাকে। হানিফা গোত্রের অর্ধেক লোক, যাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার, মুসাইলামার দলভুক্ত হয়ে পড়ে। নবীজির ওফাতের সংবাদ পেয়ে হানিফা গোত্রের বাকি অর্ধেক লোকও মুসাইলামার দলে যোগ দেয়। প্রায় পুরো গোত্রই মুরতাদ হয়ে যায়, হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন মুসলিম অবশিষ্ট থাকেন। মহান সাহাবি সুমামা বিন উসাল (রা.) অল্প কিছু সঙ্গীসহ প্রাণ বাঁচিয়ে হানিফা গোত্র থেকে দূরে সরে আসতে সক্ষম হন।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি সেনাবাহিনী পাঠান। একটির নেতৃত্বে ছিলেন ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.), আর অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)। ইকরিমাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন শুরাহবিলের বাহিনী না আসা পর্যন্ত যুদ্ধে না জড়ান। খলিফা জানতেন মুসাইলামার বাহিনী বিশাল, কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না যে তাদের সৈন্যসংখ্যা এক লাখে পৌঁছে গেছে। প্রথম বাহিনীতে (ইকরিমার) ছিল প্রায় তিন হাজার সৈন্য এবং দ্বিতীয় বাহিনীর (শুরাহবিলের) সৈন্যসংখ্যাও এর চেয়ে বেশি ছিল না। এই সময়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) উত্তরের অঞ্চলে বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।

ইকরিমার ভুল এবং খলিফার দূরদর্শী নেতৃত্ব:

কিন্তু ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.) শুরাহবিল ইবনে হাসানার আগমনের অপেক্ষা না করেই মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ঐতিহাসিকরা ইকরিমা ও মুসাইলামার মধ্যকার সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “মুসাইলামার বাহিনী যেন ইকরিমার বাহিনীকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল।”

মদিনায় এই সংবাদ পৌঁছালে খলিফা আবু বকর (রা.) অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি বুঝতে পারেন, পরাজিত বাহিনী মদিনার দিকে ফিরে আসছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ইকরিমা (রা.)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাড়াহুড়ো করার জন্য কঠোর ভর্ৎসনা করেন এবং নির্দেশ দেন, তিনি যেন বাহিনী নিয়ে মদিনায় ফিরে না এসে সরাসরি ইয়েমেনে হুজাইফা বিন মিহসান (রা.) ও আরফাজা বিন হারসামা (রা.)-এর কাছে যান এবং তাদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করেন।

ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর এমন বড় ভুল সত্ত্বেও খলিফা আবু বকর (রা.) তাকে সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করেননি। বরং তার নেতৃত্বগুণ ও সমরপ্রজ্ঞা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। আবু বকর (রা.) হুজাইফা বিন মিহসান (রা.) এবং আরফাজা বিন হারসামা (রা.)-এর কাছে পাঠানো চিঠিতে লেখেন, “ইকরিমা তোমাদের কাছে আসছে। সে পৌঁছালে তার পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনবে, কারণ সমরবিদ্যায় সে খুবই দক্ষ।”

খলিফা সেখানে হুজাইফা বিন মিহসান (রা.)-কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং নির্দেশ দেন, যেন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করে। তিনি চাননি যে হানিফা গোত্রে একা ও বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ করে ইকরিমা যে ভুল করেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি হোক। তিনি তাদের ওমানের ‘দাবা’ অঞ্চলে অবস্থানরত মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দেন। ওমান বিজয়ের পর তাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করা হলো ‘মাহরা’ অঞ্চল, যেখানে নেতৃত্ব দেবেন আরফাজা বিন হারসামা (রা.)। ইনশাআল্লাহ, আমরা পরে সেই যুদ্ধের বিস্তারিত আলোচনা করব।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা, ইরানের পাল্টা জবাবের ইঙ্গিত

খেলাফত রাষ্ট্রে ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ (দ্বিতীয় পর্ব)

আপডেট সময় : ০৩:০৪:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬

## ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবিচল সংগ্রাম: বনু হানিফায় ইকরিমা (রা.)-এর অভিযান

মদিনা: ইসলামের সোনালী ইতিহাসে ধর্মদ্রোহিতা দমনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল বনু হানিফা গোত্রের মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর সৃষ্ট এই সংকট মোকাবিলায় খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দৃঢ় পদক্ষেপ এবং সাহাবিদের অদম্য সাহস এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই পর্বে আমরা বনু হানিফা গোত্রে ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

বনু হানিফায় ইমান ও কুফরের দ্বন্দ্ব:

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিধিদল মদিনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করত। বনু হানিফা গোত্রও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাদের মধ্যে সুমামা ইবনে উসাল (রা.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট সাহাবি। যদিও তিনি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আসেননি, বরং আলকুরতা যুদ্ধাভিযান থেকে ফেরার পথে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) তাকে বন্দি করে মদিনায় নিয়ে আসেন।

সুমামা ইবনে উসালের ইসলাম গ্রহণ ও মহানুভবতার শিক্ষা:

ইয়ামামার শাসক ও বনু হানিফার প্রধান সুমামা ইবনে উসাল (রা.) ছিলেন কুরাইশদের মিত্র এবং একসময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোর বিরোধী। মক্কায় উমরা করতে যাওয়ার পথে বন্দি হয়ে মদিনায় আসার পর তাকে মসজিদে নববির একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। প্রতিদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করতেন, “হে সুমামা, তোমার কী মনে হয়?” উত্তরে সুমামা বলতেন, “আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন, তবে একজন হত্যাযোগ্য লোককেই হত্যা করবেন। আর যদি অনুগ্রহ করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপর অনুগ্রহ করবেন। আর যদি সম্পদ চান, তবে যত ইচ্ছা চাইতে পারেন।” এই কথা শোনার পরও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে কোনো শাস্তি দেননি।

কয়েক দিন ধরে মসজিদে অবস্থানকালে সুমামা (রা.) মুসলিমদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সৌজন্যবোধ, নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াত প্রত্যক্ষ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহনশীলতা ও মহানুভবতা কাছ থেকে দেখেন। বন্দি হওয়ার তিন দিন পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে কোনো শর্ত ছাড়াই তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি গোসল করে মসজিদে ফিরে আসেন এবং কালিমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।

রাসুলের দরবারে বনু হানিফার প্রতিনিধিদল ও মুসাইলামার উত্থান:

ইসলাম গ্রহণের পর সুমামা (রা.) নিজ গোত্রে ফিরে যান এবং বনু হানিফার একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদিনায় আসেন। প্রতিনিধিদলের সকলেই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের উপহার দেন। প্রতিনিধিদল জানায়, তাদের উট ও আসবাবপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য একজন লোক বাইরে রয়ে গেছে – সে ছিল মুসাইলামা কাজ্জাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুপস্থিত মুসাইলামাকেও অন্যদের মতো উপহার দেন এবং তার প্রশংসা করে বলেন, সে আপনাদের মতোই মর্যাদার অধিকারী।

মদিনা থেকে ফিরে আসার পর মুসাইলামা ধর্মত্যাগ করে এবং নবুয়তের মিথ্যা দাবি তোলে। সে বলতে শুরু করে, “নবুয়তের বিষয়ে আমি ও মোহাম্মদ এক অন্যের অংশীদার।” সে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বলে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা “তোমাদের মুখে আমার কথা শুনে মোহাম্মদ বলেছিল, সে তোমাদের মতোই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তার এ কথা বলার মানে হলো নবুয়তের ক্ষেত্রে আমার অংশীদারত্ব মেনে নেওয়া।”

quando প্রতিনিধিদলের সদস্যরা তাকে মদিনায় গিয়ে রাসুলের হাতে বায়াত না নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে, মুসাইলামা উত্তর দেয়, “তিনি যদি পরবর্তী কর্তৃত্ব আমার হাতে সোপর্দ করতে সম্মত হন, তাহলেই আমি ইসলাম গ্রহণ করব।” এই কথা পেছন থেকে শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহর কসম, তুমি আমার কাছে এই সাধারণ কাঠখড়িটুকুও চাইলেও তোমাকে দেব না। আর আমি তোমার পরিণতি ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি, যেমনটি আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। তোমার সঙ্গে আমার পক্ষ থেকে সাবিত বিন কায়েস কথা বলবে।”

এরপর মুসাইলামা বনু হানিফায় ফিরে গিয়ে নিজেকে নবী দাবি করে এবং প্রচার করতে থাকে যে, নবুয়তের কার্যসমাধায় তাকে মুহাম্মদের অংশীদার করা হয়েছে। তার এই মিথ্যা দাবিতে বিভ্রান্ত হয়ে গোত্রের কিছু লোক তার প্রতি ঈমান আনে। নিজের নবুয়তের ভিত্তি মজবুত করার উদ্দেশ্যে সে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বার্তা পাঠায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে হেদায়েতের আহ্বান জানালেও মুসাইলামা তার দূতকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

সংকটময় পরিস্থিতি ও খলিফা আবু বকরের দৃঢ় পদক্ষেপ:

নবীজি (সা.) মুসাইলামার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে সময় তিনি ফিলিস্তিন সীমান্তে উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্বে সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। এটা ছিল নবীজির ওফাতের অল্প সময় আগের ঘটনা। অধিকাংশ সাহাবি উসামার দলে অন্তর্ভুক্ত থাকায় তৎক্ষণাৎ হানিফা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান সম্ভব হয়নি। ততদিনে মুসাইলামার অনুসারী মুরতাদদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে যায়। নবীজি (সা.) দাওয়াতের মাধ্যমে তাদের সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা কোনো কিছু আমলে নিতে রাজি ছিল না।

ধীরে ধীরে মুসাইলামার দল ভারী হতে থাকে। হানিফা গোত্রের অর্ধেক লোক, যাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার, মুসাইলামার দলভুক্ত হয়ে পড়ে। নবীজির ওফাতের সংবাদ পেয়ে হানিফা গোত্রের বাকি অর্ধেক লোকও মুসাইলামার দলে যোগ দেয়। প্রায় পুরো গোত্রই মুরতাদ হয়ে যায়, হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন মুসলিম অবশিষ্ট থাকেন। মহান সাহাবি সুমামা বিন উসাল (রা.) অল্প কিছু সঙ্গীসহ প্রাণ বাঁচিয়ে হানিফা গোত্র থেকে দূরে সরে আসতে সক্ষম হন।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি সেনাবাহিনী পাঠান। একটির নেতৃত্বে ছিলেন ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.), আর অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)। ইকরিমাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়, তিনি যেন শুরাহবিলের বাহিনী না আসা পর্যন্ত যুদ্ধে না জড়ান। খলিফা জানতেন মুসাইলামার বাহিনী বিশাল, কিন্তু তখনো তিনি জানতেন না যে তাদের সৈন্যসংখ্যা এক লাখে পৌঁছে গেছে। প্রথম বাহিনীতে (ইকরিমার) ছিল প্রায় তিন হাজার সৈন্য এবং দ্বিতীয় বাহিনীর (শুরাহবিলের) সৈন্যসংখ্যাও এর চেয়ে বেশি ছিল না। এই সময়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) উত্তরের অঞ্চলে বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন।

ইকরিমার ভুল এবং খলিফার দূরদর্শী নেতৃত্ব:

কিন্তু ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.) শুরাহবিল ইবনে হাসানার আগমনের অপেক্ষা না করেই মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ঐতিহাসিকরা ইকরিমা ও মুসাইলামার মধ্যকার সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “মুসাইলামার বাহিনী যেন ইকরিমার বাহিনীকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল।”

মদিনায় এই সংবাদ পৌঁছালে খলিফা আবু বকর (রা.) অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি বুঝতে পারেন, পরাজিত বাহিনী মদিনার দিকে ফিরে আসছে। তিনি তৎক্ষণাৎ ইকরিমা (রা.)-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাড়াহুড়ো করার জন্য কঠোর ভর্ৎসনা করেন এবং নির্দেশ দেন, তিনি যেন বাহিনী নিয়ে মদিনায় ফিরে না এসে সরাসরি ইয়েমেনে হুজাইফা বিন মিহসান (রা.) ও আরফাজা বিন হারসামা (রা.)-এর কাছে যান এবং তাদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করেন।

ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর এমন বড় ভুল সত্ত্বেও খলিফা আবু বকর (রা.) তাকে সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করেননি। বরং তার নেতৃত্বগুণ ও সমরপ্রজ্ঞা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। আবু বকর (রা.) হুজাইফা বিন মিহসান (রা.) এবং আরফাজা বিন হারসামা (রা.)-এর কাছে পাঠানো চিঠিতে লেখেন, “ইকরিমা তোমাদের কাছে আসছে। সে পৌঁছালে তার পরামর্শ মনোযোগ দিয়ে শুনবে, কারণ সমরবিদ্যায় সে খুবই দক্ষ।”

খলিফা সেখানে হুজাইফা বিন মিহসান (রা.)-কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং নির্দেশ দেন, যেন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করে। তিনি চাননি যে হানিফা গোত্রে একা ও বিচ্ছিন্নভাবে আক্রমণ করে ইকরিমা যে ভুল করেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি হোক। তিনি তাদের ওমানের ‘দাবা’ অঞ্চলে অবস্থানরত মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দেন। ওমান বিজয়ের পর তাদের পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করা হলো ‘মাহরা’ অঞ্চল, যেখানে নেতৃত্ব দেবেন আরফাজা বিন হারসামা (রা.)। ইনশাআল্লাহ, আমরা পরে সেই যুদ্ধের বিস্তারিত আলোচনা করব।