ঢাকা ১২:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

কাশ্মীরে ‘ইসরাইলি মডেল’ অনুসরণের বিতর্ক: মোদি সরকারের নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৫২:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কয়েক মাস পর, ২০১৯ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী কাশ্মীর শাসনে ‘ইসরাইলি মডেল’ গ্রহণের আহ্বান জানান। তার এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যে, ভারত সরকার কি কাশ্মীর সংকট মোকাবিলায় ইসরাইলের কিছু নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করছে।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ টেনে চক্রবর্তী অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের বসতি স্থাপনের উদাহরণ দেন। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে এই প্রশ্নটি জোরালো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আদর্শগতভাবে ‘হিন্দুত্ব’-ভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামোর পক্ষে। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতকে একটি হিন্দু জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। গবেষকদের মতে, এই জাতীয়তাবাদী ধারণার সঙ্গে ইসরাইলের জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র ধারণার একটি মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

বিগত দশকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে কিছু দাঙ্গা বা উত্তেজনার পর অভিযুক্তদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা সমালোচকদের কাছে “বুলডোজার ন্যায়বিচার” নামে পরিচিতি লাভ করেছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই নীতির জন্য “বুলডোজার বাবা” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের নভেম্বরে এক রায়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সম্পত্তি ভাঙার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করে যে এই ধরনের অভিযান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ভারত ইসরাইলি ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারি প্রযুক্তির অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। দুই দেশের মধ্যে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরে একটি হামলার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন ভারতের কিছু টেলিভিশন বিতর্কে ইসরাইলে হামাসের আক্রমণের সঙ্গে তুলনা টানা হয়।

নজরদারি প্রযুক্তি নিয়েও বিতর্ক কম নয়। ইসরায়েলি সংস্থা NSO Group-এর তৈরি স্পাইওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে ভারতে সাংবাদিক ও বিরোধী নেতাদের উপর নজরদারির অভিযোগ উঠেছিল। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কিছু ডিভাইসে ম্যালওয়্যার শনাক্ত করলেও, সেটি পেগাসাস কিনা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

সমালোচকদের মতে, ২০১৯ সালের পর থেকে কাশ্মীরে সামরিক উপস্থিতি, নজরদারি এবং আইনি ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অঞ্চলটি কার্যত দীর্ঘস্থায়ী জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে এসব পদক্ষেপ সন্ত্রাসবাদ দমন, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক কি কেবল কৌশলগত ও প্রতিরক্ষাগত সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি শাসনব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রেও পারস্পরিক প্রভাব ফেলছে? কাশ্মীর উপত্যকা এই বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিএনপি সরকারের পাশে সর্বাত্মকভাবে থাকবে চীন: রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন

কাশ্মীরে ‘ইসরাইলি মডেল’ অনুসরণের বিতর্ক: মোদি সরকারের নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০৫:৫২:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কয়েক মাস পর, ২০১৯ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী কাশ্মীর শাসনে ‘ইসরাইলি মডেল’ গ্রহণের আহ্বান জানান। তার এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যে, ভারত সরকার কি কাশ্মীর সংকট মোকাবিলায় ইসরাইলের কিছু নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করছে।

কাশ্মীরি পণ্ডিতদের পুনর্বাসনের প্রসঙ্গ টেনে চক্রবর্তী অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের বসতি স্থাপনের উদাহরণ দেন। তার এই বক্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে এই প্রশ্নটি জোরালো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আদর্শগতভাবে ‘হিন্দুত্ব’-ভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামোর পক্ষে। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতকে একটি হিন্দু জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। গবেষকদের মতে, এই জাতীয়তাবাদী ধারণার সঙ্গে ইসরাইলের জাতীয় পরিচয়ভিত্তিক রাষ্ট্র ধারণার একটি মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

বিগত দশকে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে কিছু দাঙ্গা বা উত্তেজনার পর অভিযুক্তদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা সমালোচকদের কাছে “বুলডোজার ন্যায়বিচার” নামে পরিচিতি লাভ করেছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই নীতির জন্য “বুলডোজার বাবা” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের নভেম্বরে এক রায়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সম্পত্তি ভাঙার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করে যে এই ধরনের অভিযান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। ভারত ইসরাইলি ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারি প্রযুক্তির অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। দুই দেশের মধ্যে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরে একটি হামলার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন ভারতের কিছু টেলিভিশন বিতর্কে ইসরাইলে হামাসের আক্রমণের সঙ্গে তুলনা টানা হয়।

নজরদারি প্রযুক্তি নিয়েও বিতর্ক কম নয়। ইসরায়েলি সংস্থা NSO Group-এর তৈরি স্পাইওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে ভারতে সাংবাদিক ও বিরোধী নেতাদের উপর নজরদারির অভিযোগ উঠেছিল। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কিছু ডিভাইসে ম্যালওয়্যার শনাক্ত করলেও, সেটি পেগাসাস কিনা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।

সমালোচকদের মতে, ২০১৯ সালের পর থেকে কাশ্মীরে সামরিক উপস্থিতি, নজরদারি এবং আইনি ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অঞ্চলটি কার্যত দীর্ঘস্থায়ী জরুরি অবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে এসব পদক্ষেপ সন্ত্রাসবাদ দমন, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক কি কেবল কৌশলগত ও প্রতিরক্ষাগত সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি শাসনব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রেও পারস্পরিক প্রভাব ফেলছে? কাশ্মীর উপত্যকা এই বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।