বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান সংক্রান্ত মন্তব্যকে ‘বাস্তবতাকে অস্বীকার’ এবং ‘ভাষাতত্ত্ব ও গণআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের একটি আলোচনা সভায় মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে জুবায়ের বলেন, এই মন্তব্য কেবল অসঙ্গতই নয়, বরং ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি অস্বীকার করার শামিল। তিনি মন্ত্রীর মন্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এর তীব্র নিন্দা জানান।
জুবায়ের বলেন, ‘ইনকিলাব’ শব্দটি আরবি উৎস থেকে এলেও এটি উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম এবং গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বহু দশক ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভাষা কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; বরং জনগণের ব্যবহারে তা সমৃদ্ধ হয়, বিকশিত হয় এবং নিজস্ব রূপ লাভ করে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে বাংলা ভাষাও নিজস্ব সমৃদ্ধির জন্য তদ্ভব, তৎসম, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি সহ অসংখ্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করেছে। তাই, কোনো শব্দের উৎস নিয়ে তাকে ‘বাংলাবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া ভাষাবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। ভাষার প্রশ্নে বিভাজন সৃষ্টি করে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে কাম্য নয়।
জামায়াতের এই নেতা স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া স্লোগান নয়, বরং এটি শোষণ, অন্যায় ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। দেশের ছাত্র-জনতা যখন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন তাদের কণ্ঠরোধ করার জন্য ভাষাগত যুক্তি দাঁড় করানো গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
অ্যাডভোকেট জুবায়ের মন্ত্রীর ‘রক্তক্ষরণ’ বিষয়ক মন্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, জনগণের অধিকার হরণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ-দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অনিয়ম এবং বৈষম্যের মতো গুরুতর সমস্যাগুলো দেশে চরম আকার ধারণ করলেও মন্ত্রীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় না। অথচ, প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এগুলো কি মন্ত্রীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়? তিনি বলেন, এই সমস্যাগুলোই আসলে জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে, কিন্তু মন্ত্রীর মতো লোকদের হৃদয়ে তা পৌঁছায় না। দেশবাসীর প্রত্যাশা, জনগণের ন্যায্য প্রতিবাদের ভাষাকে দোষারোপ না করে বরং জনদুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই সরকারের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাংলা ভাষাকে তাদের গৌরব এবং আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে। বাংলা ভাষার ভেতরে বহুমাত্রিক শব্দভাণ্ডার ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করে। কোনো শব্দ বা স্লোগানকে কেন্দ্র করে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা পরিহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে, তারা অবিলম্বে মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়। অন্যথায়, জনগণই এর যথাযথ জবাব দেবে বলে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। দলটি দেশ ও জাতিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে।
রিপোর্টারের নাম 

























