‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী দাবি করেন, বাংলাকে ধারণ করতে হলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলা চলবে না। তার মতে, এই শব্দগুলোর সঙ্গে বাংলা ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই।
শনিবার সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ভাষা দিবসে কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলেই হবে না, বরং ভাষাকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করতে হবে। মন্ত্রীর দাবি, ‘ইনকিলাব’ আমাদের ভাষা নয় এবং যারা একসময় আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তারাই এসব শব্দ ব্যবহার করত। নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি জানি এসব বললে আমাকে অনেকেই ভারতের দালাল বা অন্য কিছু বলতে পারে, কিন্তু আমি সত্য বলব। কারণ এই ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে বলেই আজ আমি মন্ত্রী হতে পেরেছি।”
মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও ‘ইনকিলাব’, ‘ফয়সালা’, ‘জিন্দাবাদ’ ও ‘ইনসাফ’-এর মতো শব্দগুলো বাংলা ভাষায় ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিলেন। মন্ত্রীর এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও বিশিষ্ট সাংবাদিক শফিকুল আলম। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইনসাফ, ইনকিলাব, ফয়সালা বা জিন্দাবাদের মতো শব্দগুলো বাংলা ভাষারই অংশ। এমনকি রাজনৈতিক দলের নাম হিসেবে ‘আওয়ামী লীগ’ শব্দটিও সুন্দর বাংলা শব্দ হিসেবেই গণ্য।
মন্ত্রীর বক্তব্যের তাত্ত্বিক সমালোচনা করে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার একে ‘ভাষিক সাম্প্রদায়িকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শব্দতত্ত্ব অনুযায়ী বিদেশি শব্দ যখন ভাষার নিজস্ব অঙ্গে পরিণত হয়, তখন তাকে বর্জন করা কতটা যৌক্তিক? তুষারের মতে, ‘শহীদ’ বা ‘মিনার’ শব্দগুলোও তো বিদেশি উৎস থেকে আসা। তিনি বলেন, “মজুলম জননেতা ভাসানীকে কি এখন থেকে কেবল নিপীড়িত জননেতা বলতে হবে? বালতি, আলপিন বা আনারসের মতো পর্তুগিজ শব্দগুলো যদি বাংলা হতে পারে, তবে ফারসি বা উর্দু থেকে আসা শব্দ নিয়ে আপত্তি কেন?”
সমালোচকরা আরও বলছেন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনবিরোধী আন্দোলনে এই উপমহাদেশের বিপ্লবীরাই প্রথম ‘ইনকিলাব’ শব্দটি জনপ্রিয় করেছিলেন। মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলা হচ্ছে, ভাষার শুদ্ধতার নামে নির্দিষ্ট কিছু শব্দের প্রতি বিদ্বেষ মূলত ভাষাতাত্ত্বিক অজ্ঞতারই পরিচয় দেয়। বিশেষ করে ‘মীমাংসা’ শব্দটি সংস্কৃতজাত হওয়া সত্ত্বেও যদি বাংলা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়, তবে আরবি বা ফারসি উৎস থেকে আসা ‘ফয়সালা’ শব্দটিকে বর্জন করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে ইতিহাসের অপলাপ ও ভাষাতাত্ত্বিক সংকীর্ণতা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বাংলা ভাষা তার দীর্ঘ পথচলায় নানা ভাষার শব্দকে আপন করে নিয়েছে এবং এটাই এই ভাষার বৈচিত্র্য ও শক্তি। শব্দ নিয়ে এমন বিভাজন ভাষাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে সংকুচিত করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিপোর্টারের নাম 

























