ঢাকা ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

সোমেশ্বরীর নাব্য সংকট: শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার অস্তিত্ব সংকটে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২০:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক সোমেশ্বরী নদী তার নাব্য হারিয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার, যা একসময় দেশের অন্যতম প্রধান ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে নদী সংকটের কারণে বাজারের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে এবং এর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।

প্রাকৃতিক নিয়মে হেমন্তের শুরুতেই সোমেশ্বরীর পানি কমতে শুরু করে এবং নদীটি অগভীর হয়ে বিস্তীর্ণ চরে পরিণত হয়। এই নদীপথই ছিল মধ্যনগর বাজারের মূল বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই নদীপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরব, আশুগঞ্জ, জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা পর্যন্ত পরিবহন করা হতো। কিন্তু নদীর পানি কমে যাওয়ায় মৌসুমী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে একাধিক স্থানে পণ্য নামিয়ে ছোট নৌকায় স্থানান্তর করে পরিবহন করতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি করছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারের সামগ্রিক বাণিজ্যে।

নদীর পানি কমে যাওয়ায় কৃষিজমিতে সেচের জন্য গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্পের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। একইসঙ্গে, আগাম বন্যার আশঙ্কাও কৃষকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝিদের ভাষ্যমতে, পৌষের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশে পানি এতটাই কমে যায় যে, কিছু অংশে জেগে ওঠা চরে স্থানীয়রা ধানও রোপণ করেন। এই সময়ে বড় নৌকার চলাচল প্রায় তিন থেকে চার মাস বন্ধ থাকে।

মধ্যনগর বাজার আড়ত কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুণ রায় জানান, “আগে যেখানে এক নৌকাতেই হাজার মণের বেশি ধান আনা-নেওয়া করা যেত, এখন ছোট নৌকায় ভাগ করে আনতে হচ্ছে। মাঝপথে নৌকা বদলানোর কারণে সময় বেশি লাগছে এবং খরচও অনেক বেড়ে গেছে।”

স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী শম্ভু রায় বলেন, “মালামাল পরিবহনের খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই অতিরিক্ত খরচের প্রভাব পণ্যের দামেও পড়ছে।”

মৎস্য ব্যবসায়ী মুখলেছ মিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “নদীটি বাঁচলে বাজার বাঁচবে। যেভাবে এটি চরে পরিণত হচ্ছে, তাতে আর কয়েক বছর পর হয়তো নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।”

মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বলেন, “নদীর নাব্য হারানোর ফলে কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আড়তদার—সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছি। দ্রুত খননকাজ শুরু না হলে মধ্যনগর বাজার তার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে।”

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের এ নদীটি খনন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। আমি প্রায় দেড় দশক ধরে সোমেশ্বরী ও গুমাই নদী খনন করে কংস নদীর সাথে সংযুক্ত করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। এই নদীগুলো খনন করা গেলে হাওর এলাকার কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং বন্যার ঝুঁকিও কমবে। একই সঙ্গে মধ্যনগর বাজারও বাণিজ্যিকভাবে নতুন জীবন ফিরে পাবে।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, “সুনামগঞ্জের প্রায় ১৯টি নদী খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নদী সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সোমেশ্বরী নদীও সেই তালিকায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই খননকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে ইসরাইলি হামলায় খামেনির পরিবারের সদস্যসহ প্রাণহানি: উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা

সোমেশ্বরীর নাব্য সংকট: শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার অস্তিত্ব সংকটে

আপডেট সময় : ০৯:২০:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক সোমেশ্বরী নদী তার নাব্য হারিয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল শতবর্ষী মধ্যনগর বাজার, যা একসময় দেশের অন্যতম প্রধান ধানের আড়ত হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে নদী সংকটের কারণে বাজারের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে এবং এর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।

প্রাকৃতিক নিয়মে হেমন্তের শুরুতেই সোমেশ্বরীর পানি কমতে শুরু করে এবং নদীটি অগভীর হয়ে বিস্তীর্ণ চরে পরিণত হয়। এই নদীপথই ছিল মধ্যনগর বাজারের মূল বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য এই নদীপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, ভৈরব, আশুগঞ্জ, জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা পর্যন্ত পরিবহন করা হতো। কিন্তু নদীর পানি কমে যাওয়ায় মৌসুমী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে একাধিক স্থানে পণ্য নামিয়ে ছোট নৌকায় স্থানান্তর করে পরিবহন করতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি করছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারের সামগ্রিক বাণিজ্যে।

নদীর পানি কমে যাওয়ায় কৃষিজমিতে সেচের জন্য গভীর নলকূপ বা সাবমার্সিবল পাম্পের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। একইসঙ্গে, আগাম বন্যার আশঙ্কাও কৃষকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নৌকার মাঝিদের ভাষ্যমতে, পৌষের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশে পানি এতটাই কমে যায় যে, কিছু অংশে জেগে ওঠা চরে স্থানীয়রা ধানও রোপণ করেন। এই সময়ে বড় নৌকার চলাচল প্রায় তিন থেকে চার মাস বন্ধ থাকে।

মধ্যনগর বাজার আড়ত কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুণ রায় জানান, “আগে যেখানে এক নৌকাতেই হাজার মণের বেশি ধান আনা-নেওয়া করা যেত, এখন ছোট নৌকায় ভাগ করে আনতে হচ্ছে। মাঝপথে নৌকা বদলানোর কারণে সময় বেশি লাগছে এবং খরচও অনেক বেড়ে গেছে।”

স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী শম্ভু রায় বলেন, “মালামাল পরিবহনের খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই অতিরিক্ত খরচের প্রভাব পণ্যের দামেও পড়ছে।”

মৎস্য ব্যবসায়ী মুখলেছ মিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “নদীটি বাঁচলে বাজার বাঁচবে। যেভাবে এটি চরে পরিণত হচ্ছে, তাতে আর কয়েক বছর পর হয়তো নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।”

মধ্যনগর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বলেন, “নদীর নাব্য হারানোর ফলে কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আড়তদার—সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা দীর্ঘদিন ধরে নদী খননের দাবি জানিয়ে আসছি। দ্রুত খননকাজ শুরু না হলে মধ্যনগর বাজার তার ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারাবে।”

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের এ নদীটি খনন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। আমি প্রায় দেড় দশক ধরে সোমেশ্বরী ও গুমাই নদী খনন করে কংস নদীর সাথে সংযুক্ত করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। এই নদীগুলো খনন করা গেলে হাওর এলাকার কৃষি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং বন্যার ঝুঁকিও কমবে। একই সঙ্গে মধ্যনগর বাজারও বাণিজ্যিকভাবে নতুন জীবন ফিরে পাবে।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, “সুনামগঞ্জের প্রায় ১৯টি নদী খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নদী সমন্বিত ড্রেজিং প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সোমেশ্বরী নদীও সেই তালিকায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই খননকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”