ঢাকা ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

নওগাঁর জবই বিল: শীত পেরিয়েও পাখির মেলা, সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ, অভয়ারণ্যের দাবি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১৬:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

নওগাঁ জেলার সীমান্তঘেঁষা সাপাহার উপজেলার নয়নাভিরাম জবই বিল। শীত মৌসুম বিদায় নিলেও এখানকার আকাশ-বাতাস এখনো মুখর দেশি-বিদেশি পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে। হাজার হাজার পাখির নিরাপদ বিচরণভূমি হয়ে ওঠা এই বিল যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য, তবে সাম্প্রতিক জরিপে পাখির সংখ্যা কমে আসায় দেখা দিয়েছে উদ্বেগ এবং অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি।

উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী জবই বিল। খাবারের খোঁজে আর শীত নিবারণের আশায় ঝাঁকে ঝাঁকে আসা অতিথি পাখিরা বিলটিকে করে তুলেছে এক জীবন্ত চিত্রপট। বিলের স্বচ্ছ জলরাশি আর সবুজের সমারোহে পাখির ওড়াউড়ি, ডুবসাঁতার ও জলকেলিতে তৈরি হয় এক মন মুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীত মৌসুমের শুরু থেকে বিলের পানি কমতে থাকায় ছোট মাছ, শামুক ও পোকামাকড়ের প্রাচুর্য দেখা যায়। জবই বিল ও এর সংলগ্ন পুনর্ভবা নদীতে এই পর্যাপ্ত খাবারের সন্ধানেই প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসে হাজারো পাখি। দিন-রাত এসব স্থানে তাদের বিচরণ আর কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকে পুরো বিল এলাকা।

জবই বিলে আসা উল্লেখযোগ্য পাখির মধ্যে রয়েছে শামুকখোল, সাদা বক, বালিহাঁস, চাহা, রাজহাঁস, পাতি সরালী, লালঝুটি ভুতিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, তিলি হাঁস, টিকি হাঁস, পিয়াং হাঁস, ঠেঙ্গি হাঁস, চা পাখি, বেগুনি বক, বাজলা বক, মাছমুরাল, সাপ পাখি, চখা-চখি এবং নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি হাঁস।

জবই বিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি সোহানুর রহমান সবুজ জানান, বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী বিলে পাতি সরালি, লালঝুটি ভুতিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, তিলি হাঁস, টিকি হাঁস, পিয়াং হাঁস, ঠেঙ্গি হাঁস, চা পাখি, বেগুনি বক, বাজলা বক, শামুকখোল, মাছমুরাল, সাপ পাখি, চখা-চখি, হরেক রকম হাঁসের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তিনি আশা করছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বিলটি পাখির সমাহারে ভরে উঠবে।

তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, তাদের সর্বশেষ জরিপে ২৬ ধরনের পরিযায়ী পাখি এবং ১৮ ধরনের দেশি পাখি মিলিয়ে মোট ৪৪ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে। বর্তমানে এই বিলে দেশি-বিদেশি মোট পাখির সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২৫৮টি, যা গত বছর প্রায় ১১ হাজার ছিল। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রজাতির সংখ্যা বাড়লেও পাখির মোট সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংস্থার সভাপতি সোহানুর রহমান সবুজ।

এলাকাবাসী আরও জানান, বর্ষার শেষভাগে বিলের পানি কমতে শুরু করলে ফসলি আবাদি জমি পানির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। এসব জমিতে স্বল্প পরিমাণ পানি থাকায় ছোট মাছ, শামুক ও পোকামাকড়ের আমদানি বেশি হয়, যা পাখির খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। ফলস্বরূপ, জবই বিল এলাকা প্রাকৃতিক লীলার এক মনোমুগ্ধকর অভয়াশ্রমে পরিণত হয়।

প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয়রা আশা করছেন, এসব অতিথি পাখি যাতে কোনো শিকারির কবলে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি বাড়াবে। একই সঙ্গে সাপাহারের এই ঐতিহ্যবাহী জবই বিলটিকে একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং সারা বছর বিলে পাখির নিরাপদে বসবাসের জন্য একটি অংশ সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সরকারিভাবে অভয়ারণ্য নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থী ও পাখিপ্রেমীরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানে ইসরাইলি হামলায় খামেনির পরিবারের সদস্যসহ প্রাণহানি: উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা

নওগাঁর জবই বিল: শীত পেরিয়েও পাখির মেলা, সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ, অভয়ারণ্যের দাবি

আপডেট সময় : ০৯:১৬:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নওগাঁ জেলার সীমান্তঘেঁষা সাপাহার উপজেলার নয়নাভিরাম জবই বিল। শীত মৌসুম বিদায় নিলেও এখানকার আকাশ-বাতাস এখনো মুখর দেশি-বিদেশি পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে। হাজার হাজার পাখির নিরাপদ বিচরণভূমি হয়ে ওঠা এই বিল যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য, তবে সাম্প্রতিক জরিপে পাখির সংখ্যা কমে আসায় দেখা দিয়েছে উদ্বেগ এবং অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি।

উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী জবই বিল। খাবারের খোঁজে আর শীত নিবারণের আশায় ঝাঁকে ঝাঁকে আসা অতিথি পাখিরা বিলটিকে করে তুলেছে এক জীবন্ত চিত্রপট। বিলের স্বচ্ছ জলরাশি আর সবুজের সমারোহে পাখির ওড়াউড়ি, ডুবসাঁতার ও জলকেলিতে তৈরি হয় এক মন মুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীত মৌসুমের শুরু থেকে বিলের পানি কমতে থাকায় ছোট মাছ, শামুক ও পোকামাকড়ের প্রাচুর্য দেখা যায়। জবই বিল ও এর সংলগ্ন পুনর্ভবা নদীতে এই পর্যাপ্ত খাবারের সন্ধানেই প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসে হাজারো পাখি। দিন-রাত এসব স্থানে তাদের বিচরণ আর কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকে পুরো বিল এলাকা।

জবই বিলে আসা উল্লেখযোগ্য পাখির মধ্যে রয়েছে শামুকখোল, সাদা বক, বালিহাঁস, চাহা, রাজহাঁস, পাতি সরালী, লালঝুটি ভুতিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, তিলি হাঁস, টিকি হাঁস, পিয়াং হাঁস, ঠেঙ্গি হাঁস, চা পাখি, বেগুনি বক, বাজলা বক, মাছমুরাল, সাপ পাখি, চখা-চখি এবং নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি হাঁস।

জবই বিল জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি সোহানুর রহমান সবুজ জানান, বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী বিলে পাতি সরালি, লালঝুটি ভুতিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, তিলি হাঁস, টিকি হাঁস, পিয়াং হাঁস, ঠেঙ্গি হাঁস, চা পাখি, বেগুনি বক, বাজলা বক, শামুকখোল, মাছমুরাল, সাপ পাখি, চখা-চখি, হরেক রকম হাঁসের আনাগোনা শুরু হয়েছে। তিনি আশা করছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বিলটি পাখির সমাহারে ভরে উঠবে।

তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, তাদের সর্বশেষ জরিপে ২৬ ধরনের পরিযায়ী পাখি এবং ১৮ ধরনের দেশি পাখি মিলিয়ে মোট ৪৪ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে। বর্তমানে এই বিলে দেশি-বিদেশি মোট পাখির সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২৫৮টি, যা গত বছর প্রায় ১১ হাজার ছিল। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রজাতির সংখ্যা বাড়লেও পাখির মোট সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংস্থার সভাপতি সোহানুর রহমান সবুজ।

এলাকাবাসী আরও জানান, বর্ষার শেষভাগে বিলের পানি কমতে শুরু করলে ফসলি আবাদি জমি পানির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। এসব জমিতে স্বল্প পরিমাণ পানি থাকায় ছোট মাছ, শামুক ও পোকামাকড়ের আমদানি বেশি হয়, যা পাখির খাদ্য চাহিদা পূরণ করে। ফলস্বরূপ, জবই বিল এলাকা প্রাকৃতিক লীলার এক মনোমুগ্ধকর অভয়াশ্রমে পরিণত হয়।

প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয়রা আশা করছেন, এসব অতিথি পাখি যাতে কোনো শিকারির কবলে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি বাড়াবে। একই সঙ্গে সাপাহারের এই ঐতিহ্যবাহী জবই বিলটিকে একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং সারা বছর বিলে পাখির নিরাপদে বসবাসের জন্য একটি অংশ সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সরকারিভাবে অভয়ারণ্য নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থী ও পাখিপ্রেমীরা।