রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রেকর্ড আমদানি হয়েছে দেশে। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের গুদামগুলো এখন পণ্যে ঠাসা। বেচাকেনাও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। অথচ এমন পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ব্যস্ততার মধ্যেও রহস্যজনকভাবে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেন বাজারের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না— এমন প্রশ্ন এখন ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট মহলের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের চিত্র ভিন্ন। প্রতিটি দোকান ও গুদাম নিত্যপণ্যে ঠাসা। বাজারের অলিগলি ছাড়িয়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের দীর্ঘ সারি পৌঁছেছে জেলগেট পর্যন্ত। শ্রমিকরা দিনরাত পণ্য ওঠানামা করাচ্ছেন, কোথাও ঠেলাগাড়িতে চলছে সরবরাহ। প্রতিটি আড়তে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়— জমজমাট বেচাকেনা।
এমন জমজমাট বেচাকেনা ও পর্যাপ্ত সরবরাহ সত্ত্বেও নিত্যপণ্যের দাম কমার বদলে উল্টো বাড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেও নিত্যপণ্যের দামের লাগাম টানতে পারছেন না। ভোক্তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর গত ছয় দিনে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা ও নির্বাচন উপলক্ষে সরকারি ছুটিকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হলেও এখন সেসব পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবু মূল্যবৃদ্ধি থামছে না।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসা মূলত কমিশনভিত্তিক। দেশের বড় আমদানিকারকরা এখানকার আড়তদারদের মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করেন। তবে কিছু বিক্রেতা এখন সরাসরি আমদানিও করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, এবার রমজানকে টার্গেট করে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে। তবে নির্বাচনের কারণে শুরুতে বাজার জমতে সময় লাগে। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পড়ে। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বাজার সচল হলেও চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিকারকরা দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলাইমান বাদশা বলেন, “দাম বাড়ানো বা কমানোর মূল সিদ্ধান্ত আমদানিকারকদের। বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর হঠাৎ তারা বেশি দামে পণ্য বিক্রির নির্দেশ দিয়েছেন। এর কোনো যৌক্তিক কারণ আমি দেখছি না।”
বাজারে তিন ধরনের ছোলা বিক্রি হয়। নির্বাচনের আগে যে সাধারণ মানের ছোলা ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৭৪-৭৫ টাকা। ভালো মানের ছোলা ৭৪-৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-৮২ টাকায় ঠেকেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি ৭৪ টাকা কেজি দরের মটর ডাল এখন ৭৮ টাকা। ৭৫ টাকার মসুর ডাল বেড়ে হয়েছে ৮১-৮২ টাকা। ছোলা মণপ্রতি চার হাজার টাকা থেকে বেড়ে চার হাজার ২০০ টাকায় উঠেছে। শুকনো মরিচ কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে ৩৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সব নিত্যপণ্যে এমন মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে।
রমজানের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পণ্য খেজুর। প্রতি বছর খেজুরের বাজারে কারসাজির অভিযোগ থাকায় সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার দুই মাস আগে শুল্কহার ১০ শতাংশ কমায়। এই সুযোগে দেশে ৪৭ হাজার ৭৩ টন খেজুর আমদানি হয়েছে। আমদানি বাড়ায় প্রথমদিকে দাম কিছুটা কমলেও এখন আবার কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বিভিন্ন মানের খেজুরে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, রমজানে দেশের প্রায় ৩ লাখ টন ভোজ্য তেল, আড়াই লাখ টন চিনি, ১ লাখ টন ছোলা এবং ৮০-৯০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা থাকে। এর বিপরীতে রমজানের আগেই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টন ছোলা, ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন ভোজ্য তেল, ৩ লাখ টন চিনি এবং প্রায় ১ লাখ টন খেজুর।
কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন নিশ্চিত করেছেন, “অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর প্রতিটি পণ্যের আমদানি বেশি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাজারে সংকট তৈরির কোনো আশঙ্কা নেই।” তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাড়ে সাত মাসে ১৭ ক্যাটাগরির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে ৪৭ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা শুল্ক আদায় হয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, “রমজানকে ঘিরে ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর যে সিন্ডিকেট করে, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নির্বাচনের ব্যস্ততার মধ্যে বিষয়টি নজরে আসেনি। প্রশাসনের সক্রিয়তা প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। মধ্য রমজান পর্যন্ত মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।” তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান বাড়ানোর দাবি জানান। পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সরকারি নজরদারি সত্ত্বেও নিত্যপণ্যের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের রমজানের প্রস্তুতিকে কঠিন করে তুলেছে।
রিপোর্টারের নাম 






















