## সংস্কারের শপথ এড়িয়ে জুলাইকে অবজ্ঞা: সরকারি দলের বিরুদ্ধে জামায়াতের অভিযোগ
ঢাকা: জাতীয় সংসদে সরকারি দল জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে সংস্কারের শপথ এড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার (১১ জুন) দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ জনআকাঙ্খার বিপরীতে সরকারি দলের অবস্থান স্পষ্ট করে এবং সংস্কারের প্রতি তাদের অবজ্ঞা প্রকাশ করে।
জামায়াতে ইসলামী ও এর শরিক ১১ দলীয় ঐক্যবদ্ধ জোটের সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি দল কেন একটি নির্দিষ্ট শপথ নিয়েছে, তার ব্যাখ্যা তারা দিয়েছে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। বরং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ফলেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যারা এই নির্বাচন ও সংসদকে সম্ভব করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গোটা দেশবাসী সেদিন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
জামায়াত আমির জানান, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছেন। যারা তাদের ভোট দিয়েছেন, তাদের প্রতি সম্মান রেখে তারা একমত হয়েছেন যে, এই শপথ নেওয়া তাদের কর্তব্য। তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতি আশা করেছিল, দেশের মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের ভোটের আমানত প্রয়োগ করবে। দুঃখের বিষয়, এটা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বেশ কিছু জায়গায় সমস্যা হয়েছে।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথের দিন ছিল। সোমবার গভীর রাতে চিঠি পাওয়ায় কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হলেও নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেশবাসীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা শপথ নিতে এসেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বে একই দিনে একই সময়ে শপথ অনুষ্ঠিত হতো, কিন্তু এবার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি দল আগে শপথ নিয়েছে। সংসদ সচিবালয় থেকে দেওয়া দাওয়াতনামায় দুটি শ como উল্লেখ ছিল: প্রথমে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ এবং পরবর্তীতে জুলাই সনদের গণভোটের ভিত্তিতে সংস্কারের শপথ। কিন্তু সংসদে প্রবেশের পর তারা জানতে পারেন, সরকারি দল সকালে শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছে।
তিনি বলেন, “যদিও সংস্কারের শপথ না নেওয়ার বিষয়ে সরকারি দল তাদের ব্যাখ্যায় বলেছেন, সংসদ বসলে প্রভিশন ক্রিয়েট করে তারা এটা দেখবেন, আমরা এটা দ্রুত দেখতে চাই। যদি তারা জুলাইকে সম্মান ও সংস্কারকে ধারণ করেন, আজকের শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রীও নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে গিয়ে বলেছেন-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। যদি এর প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল হন, আমরা মনে করি তারা ওই শপথটাও নেবেন।” ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, “আমরা দেখতে চাই, জুলাই সম্মানিত হয়েছে এবং জুলাই স্বীকৃত হয়েছে। জুলাইকে অসম্মান-অশ্রদ্ধা এবং স্বীকৃতি না দিয়ে ছাব্বিশের এই পার্লামেন্ট নিশ্চয়ই কোনো গৌরবের আসনে বসতে পারবে না।”
জামায়াত আমির আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারি দলও দুটি শপথ নেবে, যেমনটি তারা (জামায়াত) নিয়েছেন। বিকেলের শপথ অনুষ্ঠানে তারা অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন এবং প্রত্যেকের জন্য তিনটি করে কার্ডও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা “ধাক্কা খেয়েছেন”। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের প্রতি অশ্রদ্ধা করতে পারি না। যে কারণে আমাদের শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পারায় আমাদের আফসোসের জায়গা থেকে গেলো।”
ডা. শফিকুর রহমান আরও জানান, জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর সরকারি প্লট সুবিধা না নেওয়া এবং ট্যাক্সবিহীন গাড়িতে চড়বেন না—এমন প্রতিজ্ঞা তাদের দলের। এই সিদ্ধান্তে তারা অবিচল রয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সরকারি দল হতে পারিনি এ নিয়ে কোনো আফসোস নেই। আমাদের আফসোসের জায়গা—পরপর তিনটি নির্বাচন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর জাতি খুব আশা করেছিল, যেভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে তারা ভোট দিয়েছিলেন, সেই ভোটের প্রতিফলনটা হবে ফলাফলে। কিন্তু সেখানে অনেক কিছু ঘটেছে, তা অন্য একদিন বলবো।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা দেশকে ভালবাসি। দেশ ও জনগণের ভালোর জন্য সরকারও যদি কোনো উদ্যোগ নেয়, আমাদের সমর্থন তারা পাবেন। কিন্তু আমরা দেশ ও জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে যদি কিছু দেখি, তাহলে আমরা জনগণের হয়ে এই জনস্বার্থবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করবো, জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ।” তিনি বলেন, তারা এই শপথ না নিলেও পারতেন, তবে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য শত কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তারা সংসদে অংশগ্রহণ করছেন।
এদিকে, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খলিলুর রহমানের মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেওয়া অনৈতিক। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনের আগে ছাত্র উপদেষ্টারা নির্বাচনের নিরপেক্ষতার স্বার্থে পদত্যাগ করেছিলেন। এখন ড. খলিলুর রহমান যদি বিএনপি সরকারের অংশ হন, তবে পূর্বের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওই রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে কাজ করেছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠবে। তিনি বলেন, “নির্বাচনে যে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা আমরা বলছি, আমরা যেটা দেখলাম—ফলাফলে কারচুপি হলো। আমাদের অনেকগুলো আসনে হারিয়ে দেওয়া হলো এবং পরিকল্পনা করে দুই-তৃতীংশ আসন সরকারি দল নিয়ে নিলো।”
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “সংস্কার যাতে না হয় তার জন্য পুরো একটি ইঞ্জিনিয়ারিং এই মুহূর্তে আমরা দেখতে পাচ্ছি। খলিলুর রহমানের মন্ত্রিপরিষদে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে আজকে জাতির সামনে তা উন্মোচন হচ্ছে।”
এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির ও বিরোধী দলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সহ অন্যান্য সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 
























