ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে সাত স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, তারা সবাই বিএনপির সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হয়েছিলেন। বহিষ্কারের খড়্গ নিয়ে ভোটের মাঠে নেমে তারাই বাজিমাত করেছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং জয়ী হওয়া এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন কী করবেন? তারা কি দলে ফিরবেন? দলে ফিরতে চাইলেই কি ফেরা যাবে? নাকি, তাদের কেউ কেউ দলের বাইরেই থাকতে চান? এরকম নানা প্রশ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছেন দেশের মানুষ। তবে সিদ্ধান্ত উভয়পক্ষের। এটা মূলত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেন তার ওপর।
রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যখন কোনও কর্মী বিদ্রোহী হন, তখন তিনি জয়ী হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলে ফেরা নিশ্চিত নয়— এটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতিনির্ভর। তবে, বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের দলে ফেরার সম্ভাবনা বাড়ে— যখন তারা প্রকাশ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত মানার অঙ্গীকার করেন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতা হয়। এখন জয়ী সাতজন কে কী করবেন বা তাদের বিষয়ে দল কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা সময়ই বলতে পারবে। যদিও জয়ী বিদ্রোহীদের মধ্যে প্রায় সবাই দলের হয়ে কাজ করতে চান। দলে ফিরতে চান— ডাকের অপেক্ষায় আছেন। কেবল রুমিন ফারহানা এখনও স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ‘হাঁস’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন আলোচিত নারী প্রার্থী রুমিন ফারহানা। নিজ দল বিএনপির কাছ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে দল তাকে বহিষ্কারও করে। নির্বাচনে রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৭ ভোট। পূর্বের নিজ দল থেকে কোনও ধরনের ডাক পেয়েছেন কিনা? কিংবা দলে ফেরার ইচ্ছে আছে কিনা? জানতে চাইলে এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতে চাননি তিনি। বরং বলেন, ‘‘এ নিয়ে পরে মন্তব্য করবো। এই মুহূর্তে আমি অসুস্থ।’’
দিনাজপুর পাঁচ আসন (ফুলবাড়ী-পার্বতীপুর) থেকে ‘তালা’ প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এ. জেড. এম. রেজওয়ানুল হক। বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান তিনি। পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৫০ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচন করা মো. আব্দুল আহাদ পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৪৮ ভোট।
একই প্রশ্ন করা হলে নির্বাচিত এই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘‘এটা দলের সিদ্ধান্ত। দল যদি চায়, তাহলে আমি দলে ফিরতে চাই।’’
চাঁদপুর-৪ আসনে ‘চিংড়ি’ প্রতীকে বিজয়ী বিএনপি বিদ্রোহী প্রার্থী ও ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এম. এ হান্নান নিজেকে দলের লোক ও অবশ্যই তিনি দলে যাবেন বলে জোর দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছি, সে হিসেবেই আমাকে শপথ গ্রহণ করতে হবে। আমি আইন জানতাম না। তাই আগে শপথ গ্রহণ করি, তারপর প্রক্রিয়াগতভাবে দলের হয়েই আমি কাজ করবো। আমি দলের লোক, অবশ্যই দলে যাবো।’’ তবে দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে এখনও এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়নি বলেও তিনি জানান।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে স্বতস্ত্র প্রার্থী হয়েছেন লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি দলে ফিরতে চান কিনা বা দল থেকে যোগাযোগ করেছে কিনা. প্রশ্নে আজাদ বলেন, ‘‘আমি দলেই আছি। বেগম খালেদা জিয়া আমাকে দলে নিয়েছিলেন, আমি তার সঙ্গে ছিলাম। এখন তিনি নেই। এখন তারেক রহমান সাহেব আমাদের চেয়ারম্যান। ওনার সঙ্গে আমি থাকবো। যতদিন আমি বেঁচে থাকবো, ততদিন বিএনপির সঙ্গেই থাকবো।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাতে আমি কিছু মনে করিনি। আমি বিএনপির লোক, বিএনপির সঙ্গে আছি, বিএনপিতেই থাকবো। দলের কাছে এটা আমার প্রত্যাশা।’’
লুৎফর রহমান খান আজাদ এর আগে বিএনপি থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণায়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দাঁয়িত পালন করেন।
কুমিল্লা-৭ আসনে জয়ী হয়েছেন ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুল আলম। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে মনোনয়ন পান। মনোনয়ন না পেয়ে আতিকুল আলম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র ভোটে দাঁড়ালে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘‘আমরা দলের লোক। দলের কর্মী হিসেবে থাকবো। কিন্তু এখনই দলে যাবো কিনা তা বলতে পারছি না। শপথ গ্রহণের পর এই বিষয়টি সবাইকে জানাবো।’’
‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকেই মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। পরে সেই মনোনয়ন পরিবর্তন করে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে দেওয়া হয়। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইকবালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। হাঁস প্রতীক নিয়ে বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আমি দলের দুঃসময়ে বিএনপিকে উজ্জীবিত রেখেছি। সারা জীবন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দলের মনোনয়নে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ধানের শীষের পরাজয় হয়েছে। দল যদি আমাকে পাশে চায়, আমি দলের সঙ্গে থেকেই সংসদে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবো। আর যদি দল আমাকে না চায়— তবে স্বতন্ত্র হিসেবেই বিরোধী আসনে বসে এলাকার অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করবো। দল চাইলে আমি প্রস্তুত আছি। বিএনপির প্রতি আমার যে আবেগ-অনুভূতি সেটি সবসময় অটুট আছে।
সাতজনের মধ্যে কেউই দলের বিরুদ্ধাচরণ করেননি এবং ছয়জন সরাসরি দলের হয়ে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এখন কী করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বাংলা ট্রিবিউনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, দিনাজপুর, চাঁদপুর,টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
রিপোর্টারের নাম 






















