নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে বরিশাল সদর-৫ আসনে চলছে শেষ মুহূর্তের হিসেব-নিকেশ। ছয়টি আসনের মধ্যে এই আসনটিই এখন নগরজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন কি হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী, চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমকে বিজয়ী হতে সাহায্য করবে, নাকি বরাবরের মতো ধানের শীষের প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার তার ঘাঁটি ধরে রাখতে পারবেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদিও জামায়াত প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল সর্বোচ্চ ত্যাগের নিদর্শন দেখিয়ে চরমোনাই পীরের সম্মানে হাতপাখার সমর্থনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন, কিন্তু তাকে নির্বাচনি প্রচারে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন ফয়জুল করীম। এর ফলে জামায়াত এবং ১১ দলীয় জোটের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কাকে ভোট দেবেন তা নিয়ে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াতসহ জোটের ভোট যদি হাতপাখায় পড়ে, তবে নির্বাচনের ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার, যিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, তিনি শুরু থেকেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কিছুটা চাপের মুখে ছিলেন। শেষ পর্যায়ে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হলেও, তার নির্বাচনি প্রচার ততটা জমাতে পারেননি। বরং প্রচার কার্যক্রম কিছুটা অগোছালো ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে, তিনি আওয়ামী লীগের ভোটারদেরও টানার চেষ্টা করছেন, যা নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রকাশ্য বিরোধিতা সত্ত্বেও, সরোয়ার কৌশলে সব বিরোধ মিটিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে ফয়জুল করীমকে সমর্থন দেওয়ার পর, জামায়াত নেতাকর্মীরা আশা করেছিলেন যে তাদের প্রার্থী এবং দলের নেতাদের শতভাগ কাজে লাগাতে পারবেন হাতপাখার প্রার্থী। কিন্তু নির্বাচনের শেষ মুহূর্তেও ফয়জুল করীম একবারের জন্যও জামায়াত প্রার্থী হেলাল ও তার সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনি প্রচার করতে পারেননি। এমনকি কোনো জনসভায় জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণও ছিল না। এই পরিস্থিতিতে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত কর্মী জানান, মুয়াযযম হোসাইন হেলালের এই ত্যাগ একটি বড় ঘটনা। কিন্তু হাতপাখার প্রার্থী ফয়জুল করীম সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেননি। জামায়াত ভোটারদের শতভাগ কাজে লাগাতে পারলে এই আসনে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বিজয় প্রায় নিশ্চিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।
ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী ফয়জুল করীম নিজেও দাবি করছেন যে, জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোটও পাবেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী আন্দোলনের কোনো নেতা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেননি। তাই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে হাতপাখাকে ভোট দেবেন। তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন নতুন বাংলাদেশ ও ইসলামের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা যা বলেন, তাই করেন এবং তারা কারো সঙ্গে প্রতারণা করেন না।
জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে ভোট দেবেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ফয়জুল করীম বলেন, যারা চাঁদাবাজি ও দখল-লুটপাটের রাজনীতি করে, জামায়াত তাদের ভোট দেবে না। তিনি শতভাগ নিশ্চিত যে, জামায়াত সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের ভোট দেবে এবং সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশই জামায়াতের ভোট পাবে। তিনি জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহ-সেক্রেটারি জেনারেল ও বরিশাল সদর-৫ আসনের জামায়াত প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, তিনি পীর সাহেবের সম্মানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতীক হাতপাখাকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। তিনি আশাবাদী যে জামায়াতের ভোট অন্য কোথাও যাবে না, তবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি।
এদিকে, এই আসনে বাসদ নেত্রী ডা. মনিষা চক্রবর্ত্তীও ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। তিনি দিনমজুর, শ্রমিক, অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদের কাছে পরিচিত মুখ এবং তিনি আওয়ামী লীগের ভোটেও ভাগ বসাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে, সব জল্পনা-কল্পনার পরও, এখন পর্যন্ত নির্বাচনে মূলত ধানের শীষ ও হাতপাখার মধ্যেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। জামায়াতের সমর্থন যদি শেষ পর্যন্ত হাতপাখাকেই যায়, তবে এই আসনের নির্বাচনের সমীকরণ সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 
























