ঢাকা ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

খুলনা-৫ আসনে ভোটের লড়াই: পরওয়ারের জনপ্রিয়তার বিপরীতে লবির কৌশলী সমীকরণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৯:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া ও ফুলতলা) আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। এ আসনে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর লড়াইয়ে এক টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে রয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগার লবি। শুরুতে জনসমর্থনের পাল্লা জামায়াত প্রার্থীর দিকে ভারী মনে হলেও, সময় গড়ানোর সাথে সাথে কৌশলী প্রচারণায় লড়াইয়ে ফিরছেন লবি।

ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজার ৪০১ জন, যা পুরুষ ভোটারদের তুলনায় কিছুটা বেশি। এই বিপুল সংখ্যক নারী ভোটার এবং এলাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারই এবারের নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক (ফ্যাক্টর) হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

নির্বাচনী মাঠ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলী আসগার লবি মূলত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে টানার কৌশল নিয়েছেন। তবে তার এই তৎপরতাকে কেন্দ্র করে কালো টাকা ছড়ানো এবং পেশিশক্তি ব্যবহারের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে জামায়াত শিবির। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচনী পরিবেশ কলুষিত করতে বহিরাগত অস্ত্রধারী ও কালো টাকা ব্যবহার করছেন। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংখ্যালঘু নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

মাঠ পর্যায়ের চিত্র অবশ্য মিশ্র। ডুমুরিয়ার সাহস ইউনিয়নের বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, শুরুর দিকে তারা বেশ পিছিয়ে থাকলেও পরিকল্পিত প্রচারণার ফলে এখন জয়ের ব্যাপারে তারা আশাবাদী। বিশেষ করে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশ্বাস এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন লবির অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

অন্যদিকে, সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ মিয়া গোলাম পরওয়ারের ব্যক্তি ইমেজ ও স্থানীয় উন্নয়ন ভাবনার ওপর আস্থা রাখছেন। বিশেষ করে ডুমুরিয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘বিল ডাকাতিয়া’র জলাবদ্ধতা নিরসনে পরওয়ারের ভূমিকার কথা বলছেন শ্রমজীবী মানুষ। অনেক সংখ্যালঘু ভোটারও মনে করছেন, জামায়াত প্রার্থীর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও বিপদে পাশে থাকার বিষয়টি ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে জামায়াতের অবস্থান অনেককেই দলটির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে।

নির্বাচনী মাঠে নারী ভোটারদের মনোভাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শাহপুর ও থুকড়া এলাকার গৃহবধূদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরওয়ারের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে ভ্যানচালক বা ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নিজেদের সম্পদ ও জানমালের সুরক্ষায় বিএনপির প্রতীক তাদের জন্য ‘রক্ষাকবচ’ হতে পারে। আবার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক মন্দায় ক্ষুব্ধ কেউ কেউ ‘না’ ভোট দেওয়ার মানসিকতাও পোষণ করছেন।

সব মিলিয়ে খুলনা-৫ আসনে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। একদিকে জামায়াতের সুসংগঠিত ভোটব্যাংক ও পরওয়ারের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে বিএনপির লবির কৌশলী মেরুকরণ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নির্ভর করছে সাধারণ ও নীরব ভোটারদের রায়ের ওপর। এক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছেন ডুমুরিয়া-ফুলতলার মানুষ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কার্যালয় খুললেন খাগড়াছড়ি আ.লীগের নেতাকর্মীরা

খুলনা-৫ আসনে ভোটের লড়াই: পরওয়ারের জনপ্রিয়তার বিপরীতে লবির কৌশলী সমীকরণ

আপডেট সময় : ০৯:৪৯:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া ও ফুলতলা) আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। এ আসনে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর লড়াইয়ে এক টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে রয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, অন্যদিকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগার লবি। শুরুতে জনসমর্থনের পাল্লা জামায়াত প্রার্থীর দিকে ভারী মনে হলেও, সময় গড়ানোর সাথে সাথে কৌশলী প্রচারণায় লড়াইয়ে ফিরছেন লবি।

ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজার ৪০১ জন, যা পুরুষ ভোটারদের তুলনায় কিছুটা বেশি। এই বিপুল সংখ্যক নারী ভোটার এবং এলাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারই এবারের নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক (ফ্যাক্টর) হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

নির্বাচনী মাঠ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলী আসগার লবি মূলত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে টানার কৌশল নিয়েছেন। তবে তার এই তৎপরতাকে কেন্দ্র করে কালো টাকা ছড়ানো এবং পেশিশক্তি ব্যবহারের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে জামায়াত শিবির। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচনী পরিবেশ কলুষিত করতে বহিরাগত অস্ত্রধারী ও কালো টাকা ব্যবহার করছেন। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংখ্যালঘু নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

মাঠ পর্যায়ের চিত্র অবশ্য মিশ্র। ডুমুরিয়ার সাহস ইউনিয়নের বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, শুরুর দিকে তারা বেশ পিছিয়ে থাকলেও পরিকল্পিত প্রচারণার ফলে এখন জয়ের ব্যাপারে তারা আশাবাদী। বিশেষ করে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশ্বাস এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন লবির অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

অন্যদিকে, সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ মিয়া গোলাম পরওয়ারের ব্যক্তি ইমেজ ও স্থানীয় উন্নয়ন ভাবনার ওপর আস্থা রাখছেন। বিশেষ করে ডুমুরিয়ার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘বিল ডাকাতিয়া’র জলাবদ্ধতা নিরসনে পরওয়ারের ভূমিকার কথা বলছেন শ্রমজীবী মানুষ। অনেক সংখ্যালঘু ভোটারও মনে করছেন, জামায়াত প্রার্থীর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও বিপদে পাশে থাকার বিষয়টি ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে জামায়াতের অবস্থান অনেককেই দলটির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে।

নির্বাচনী মাঠে নারী ভোটারদের মনোভাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শাহপুর ও থুকড়া এলাকার গৃহবধূদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরওয়ারের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে ভ্যানচালক বা ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নিজেদের সম্পদ ও জানমালের সুরক্ষায় বিএনপির প্রতীক তাদের জন্য ‘রক্ষাকবচ’ হতে পারে। আবার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক মন্দায় ক্ষুব্ধ কেউ কেউ ‘না’ ভোট দেওয়ার মানসিকতাও পোষণ করছেন।

সব মিলিয়ে খুলনা-৫ আসনে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। একদিকে জামায়াতের সুসংগঠিত ভোটব্যাংক ও পরওয়ারের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে বিএনপির লবির কৌশলী মেরুকরণ—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নির্ভর করছে সাধারণ ও নীরব ভোটারদের রায়ের ওপর। এক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছেন ডুমুরিয়া-ফুলতলার মানুষ।