ঢাকা ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সিরিয়ার পুনর্গঠনে সৌদি আরবের বিশাল বিনিয়োগ: বিমানবন্দর ও টেলিকমসহ একাধিক খাতে চুক্তি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১৩:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ ১৪ বছরের বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে বড় ধরনের মাইলফলক অর্জন করেছে সিরিয়া। দেশটির অবকাঠামো, বিমান চলাচল, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত এই বৃহৎ বিনিয়োগ সমঝোতা সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সিরিয়ান ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির প্রধান তালাল আল-হিলালি এই বিনিয়োগ চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জানান, এই উদ্যোগের আওতায় আলেপ্পোতে একটি অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সিরিয়া ও সৌদি আরবের যৌথ মালিকানায় একটি সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা (বাজেট এয়ারলাইন) চালু এবং ‘সিল্কলিংক’ নামক একটি বিশাল টেলিযোগাযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সিরিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক সংযোগ কেন্দ্রে পরিণত করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের প্রতি সৌদি আরবের এই সমর্থন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগের এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমান এই সমঝোতাকে সিরিয়ার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ জানিয়েছেন, নবগঠিত ‘এলাফ ফান্ড’-এর মাধ্যমে আলেপ্পোর দুটি বিমানবন্দর উন্নয়নে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হবে। এই তহবিলের লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে সিরিয়ার বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা।

টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। সিরিয়ার যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুলসালাম হায়কাল জানান, এ খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর অধীনে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হাজার হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করা হবে।

বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে সৌদি আরবের খ্যাতনামা বাজেট এয়ারলাইন ‘ফ্লাইনাস’ এবং সিরিয়ান সিভিল এভিয়েশন অথরিটির মধ্যে একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ‘ফ্লাইনাস সিরিয়া’ নামে একটি নতুন এয়ারলাইন গঠিত হবে, যার ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকবে সিরিয়ার হাতে। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই এয়ারলাইনটি তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে।

এছাড়া জ্বালানি ও পানি সংকট নিরসনে সৌদি আরবের প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘এসিডব্লিউএ পাওয়ার’-এর সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

বিনিয়োগের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। সিরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাক এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিমান চলাচল ও অবকাঠামো খাতে এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব সিরিয়ার পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা কিছুটা সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিগুলো সিরিয়ার জন্য বড় রাজনৈতিক বিজয় হলেও এর বাস্তব রূপায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রকল্প সিরিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএনপিকে ‘খুনের রাজনীতি’ পরিহারের হুঁশিয়ারি দিলেন শিবির সভাপতি

সিরিয়ার পুনর্গঠনে সৌদি আরবের বিশাল বিনিয়োগ: বিমানবন্দর ও টেলিকমসহ একাধিক খাতে চুক্তি

আপডেট সময় : ১০:১৩:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দীর্ঘ ১৪ বছরের বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে বড় ধরনের মাইলফলক অর্জন করেছে সিরিয়া। দেশটির অবকাঠামো, বিমান চলাচল, জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত এই বৃহৎ বিনিয়োগ সমঝোতা সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সিরিয়ান ইনভেস্টমেন্ট অথরিটির প্রধান তালাল আল-হিলালি এই বিনিয়োগ চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জানান, এই উদ্যোগের আওতায় আলেপ্পোতে একটি অত্যাধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সিরিয়া ও সৌদি আরবের যৌথ মালিকানায় একটি সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা (বাজেট এয়ারলাইন) চালু এবং ‘সিল্কলিংক’ নামক একটি বিশাল টেলিযোগাযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সিরিয়াকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক সংযোগ কেন্দ্রে পরিণত করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের প্রতি সৌদি আরবের এই সমর্থন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সিরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগের এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমান এই সমঝোতাকে সিরিয়ার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

সৌদি বিনিয়োগমন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ জানিয়েছেন, নবগঠিত ‘এলাফ ফান্ড’-এর মাধ্যমে আলেপ্পোর দুটি বিমানবন্দর উন্নয়নে প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হবে। এই তহবিলের লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে সিরিয়ার বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা।

টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। সিরিয়ার যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুলসালাম হায়কাল জানান, এ খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর অধীনে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হাজার হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করা হবে।

বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে সৌদি আরবের খ্যাতনামা বাজেট এয়ারলাইন ‘ফ্লাইনাস’ এবং সিরিয়ান সিভিল এভিয়েশন অথরিটির মধ্যে একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ‘ফ্লাইনাস সিরিয়া’ নামে একটি নতুন এয়ারলাইন গঠিত হবে, যার ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকবে সিরিয়ার হাতে। সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই এয়ারলাইনটি তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে।

এছাড়া জ্বালানি ও পানি সংকট নিরসনে সৌদি আরবের প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘এসিডব্লিউএ পাওয়ার’-এর সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে সিরিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

বিনিয়োগের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। সিরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাক এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিমান চলাচল ও অবকাঠামো খাতে এই কৌশলগত অংশীদারিত্ব সিরিয়ার পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা কিছুটা সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিগুলো সিরিয়ার জন্য বড় রাজনৈতিক বিজয় হলেও এর বাস্তব রূপায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রকল্প সিরিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।