সপ্তম শতাব্দীতে আরব ভূখণ্ডে ইসলামের উন্মেষ ঘটলেও এর এক শতাব্দীর মধ্যেই তা উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে। তবে বাংলায় মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বখতিয়ার খলজির মাধ্যমে হলেও, এর বহু আগে থেকেই আরব বণিকদের নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক যোগাযোগ এ অঞ্চলে ইসলামের আগমনের পথ সুগম করে রেখেছিল। মূলত সামরিক বিজয়ের অনেক আগেই সুদূর আরবের সঙ্গে বাংলার অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা এখানকার সমাজে ইসলামের প্রাথমিক প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নির্দেশে অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকে সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের জন্য মুহাম্মদ ইবন কাসিমের নেতৃত্বে আরব সেনাবাহিনী অভিযান চালালেও, এর প্রভাব বাংলার মতো পূর্বাঞ্চলে তেমন গভীর ছিল না। রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনে প্রায় পাঁচ শতাব্দী সময় লেগেছিল মুসলিমদের। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি সেন রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও এই রাজনৈতিক বিজয়ের আগে সুফি-সাধকদের আগমনের কিছু লোককথা প্রচলিত আছে, তবে ঐতিহাসিক তথ্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই আরব বণিকরা এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক যোগাযোগের ভিত্তি স্থাপন করে ইসলামের আগমনের দ্বার উন্মোচন করেছিলেন।
নৌপথে বাংলার সঙ্গে আরব মুসলমানদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্ভবত ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের অল্পকাল পরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। মেসোপটেমীয় সভ্যতার সময় থেকেই ভারতের তুলা ‘সিন্ধু’ নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে গ্রিক-রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যের অবক্ষয়ের পর এই বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ পারসিকদের হাতে চলে যায়। ইসলামের উত্থানের পূর্ববর্তী শতকে আরব সাগরের বাণিজ্যে পারসিকরাই প্রভাবশালী ছিল। তবে ইসলামের আবির্ভাবের পর আরবরা আবার সমুদ্রবাণিজ্যের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
ইসলাম বাংলায় স্থল ও জল উভয় পথেই প্রবেশ করে। বখতিয়ার খলজির বঙ্গ অভিযানের সময় তুর্কি বিজেতারা স্থলপথে ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে আসে, আর জলপথে ইসলাম নিয়ে আসে আরব বণিকরা। তুর্কি বিজয়ের বহু আগেই আরব মুসলমানরা বাংলাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল মরুভূমি হওয়ায় সেখানে কৃষির অভাব ছিল, তাই আদিকাল থেকেই আরবরা ছিল বাণিজ্যনির্ভর জাতি। তৎকালীন বিশ্বে তারা শ্রেষ্ঠ নাবিক ও সমুদ্রযাত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ইসলামের আবির্ভাবের পর মুসলমানরা আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত সমুদ্রপথের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
দশম শতাব্দীতে সমুদ্রবাণিজ্যের রুটগুলোতে আরবদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূল এবং শ্রীলঙ্কা জুড়ে আরব বণিকদের বড় বড় বসতি গড়ে উঠেছিল। একই ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা দক্ষিণ চীন সাগর ও ফিলিপাইনের দ্বীপমালাতেও বিস্তৃত হয়। এই বাণিজ্যপথে আরব বণিকদের নিয়ন্ত্রণ এতটাই ব্যাপক ও প্রভাবশালী ছিল যে, ইউরোপীয়রা নিজেদের জন্য লাভজনক পথ বের করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, জোসেফের যুগ থেকে শুরু করে মার্কো পোলো ও ভাস্কো দা গামার সময় পর্যন্ত ভারতের বাণিজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিল আরবরাই। ভারতের পশ্চিম উপকূলে বিপুলসংখ্যক আরব উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, আর আরব দেশগুলোতেও বহু ভারতীয় বসতি প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ইসলামের বিস্তার এবং আরবদের ইসলাম গ্রহণের পরও এই উপনিবেশগুলো আগের মতোই বিকশিত হতে থাকে। ভারতের রাজারা নিজেদের রাজ্যে মুসলিম বিচারক নিয়োগ করতেন, যারা মুসলমানদের বিচারকাজ পরিচালনা করতেন এবং তাদের সামষ্টিক জীবন সংগঠনের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হতো। বাণিজ্যিক যোগাযোগ সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও জন্ম দেয়; ফলে বহু আরবি নৌ-পরিভাষা ও অন্যান্য শব্দ ভারতীয়রা গ্রহণ করে, আর ভারতের রীতিনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও আচরণপদ্ধতি আরবেও প্রবেশ করে। ভাষাতাত্ত্বিকরা কোরআনে ব্যবহৃত তিনটি সংস্কৃতমূল শব্দের সন্ধান পেয়েছেন—মেশক, জানবিল এবং কাফুর। এভাবে বাংলাসহ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সুদূর প্রাচ্যের চীনে বাণিজ্য যাত্রার পথে এই উপমহাদেশের বন্দরসমূহ মধ্যবর্তী স্থানে পড়তো। তাই আরব বণিকরা সেখানে বিশ্রামের জন্য থামতো এবং অবস্থান করত। ধীরে ধীরে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাংলা, বার্মা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া হয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। ফলে ভারত ও বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের এক সংযোগভূমিতে পরিণত হয়। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, সিলন থেকে আগত আরবের জাহাজ বহর সিন্ধুর দেবল উপকূলে জলদস্যুদের হাতে আক্রান্ত হয়। এর প্রেক্ষিতে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু অভিযান পরিচালনা করেন। এর ফলে শুধু আরবদের নৌযোগাযোগ নিরাপদ হয়নি, বরং সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নতুন গতি ও প্রেরণা লাভ করে।
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলার সঙ্গে আরবদের প্রাথমিক যোগাযোগ সম্পর্কে আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবে আরব ভূগোলবিদদের রচনায় পরোক্ষ কিছু বিবরণ পাওয়া যায় এবং এর মাধ্যমে সাধারণভাবে পূর্বভারত এবং বিশেষভাবে বাংলার কয়েকটি স্থান শনাক্ত করা যায়। নবম শতাব্দীর আরব ভূগোলবিদ সুলাইমানের ‘সিলসিলাতুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে একটি রাজ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়, যা পূর্ব ভারতের রুহমি রাজ্য (সম্ভবত বাংলা) হিসেবে চিহ্নিত। এই রাজ্যটি শক্তিশালী গুর্জর-প্রতিহার রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় ছিল। সুলাইমানের বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাজার মর্যাদা খুব উচ্চ না হলেও তার সৈন্যসংখ্যা বালহারা, গুর্জর বা তফকের রাজার তুলনায় অধিক ছিল। বলা হয়, তিনি যখন যুদ্ধে অভিযানে বের হতেন, তখন তার সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার হাতি থাকত। তার সৈন্যবাহিনীতে দশ থেকে পনেরো হাজার লোক ছিল, যাদের দায়িত্ব ছিল কাপড় ধোয়া ও তা প্রক্রিয়াজাত করা। তার দেশে এমন এক বিশেষ প্রকারের বস্ত্র প্রস্তুত হতো, যা অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। বস্ত্রটি এত সূক্ষ্ম ও কোমল ছিল যে, সেই বস্ত্রের তৈরি পোশাক একটি আংটির ছিদ্র দিয়েও অনায়াসে পার করা যেত। এটি তুলা থেকে প্রস্তুত হতো। সেখানে কাউরি শাঁসের মাধ্যমে বাণিজ্য ও লেনদেন পরিচালিত হতো, যা ছিল সেই দেশের প্রচলিত মুদ্রা। তাদের দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্যও বিদ্যমান ছিল।
এভাবে দেখা যায়, সামরিক বিজয়ের বহু আগে থেকেই আরব বণিকদের মাধ্যমে বাংলায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ইসলামের শান্তিপূর্ণ প্রবেশ এবং বিস্তারে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
রিপোর্টারের নাম 





















