রাজধানী ঢাকা এখন কেবলই কর্মব্যস্ততা আর যানজটের শহর নয়, বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজে মুখরিত। অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক পর্যন্ত প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার জমে উঠেছে। চায়ের দোকানে রাজনৈতিক আলাপ, মোড়ে মোড়ে আলোচনা, এমনকি বাড়ির সামনেও ঘুরে ফিরে আসছে কেবল একটিই প্রসঙ্গ—ভোট। প্রার্থীরা সকাল থেকেই ছুটে যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। কেউ পথসভায় বক্তব্য দিয়ে তুলে ধরছেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কেউ আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিচ্ছেন নির্বাচনি অঙ্গীকার। বুধবার, প্রচারণার ১৪তম দিনেও শহরজুড়ে ছিল গণসংযোগ, মিটিং, মিছিল এবং ছোট ছোট পথসভার সরব উপস্থিতি।
রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরব উপস্থিতিতে রাজধানীর নির্বাচনী মাঠে তৈরি হয়েছে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলি, হাতপাখা, ফুটবল, কোদাল, ট্রাক, মাথাল কিংবা হাঁস—নানা প্রতীকের মিছিল ও সমাবেশে শহরের দৃশ্যপটই যেন বদলে গেছে। দীর্ঘ সময় পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের মাঝেও ভোটের উষ্ণতা ফিরিয়ে এনেছে, যা রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক অন্যরকম নির্বাচনী আমেজ।
প্রার্থীদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও বক্তব্য:
ঢাকা ১৭ আসনের বিএনপি প্রার্থী তারেক রহমানের পক্ষে গণসংযোগকালে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা-১৭ আসনের বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেছেন, “নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, জামায়াতের আচরণ তত অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তাদের বর্তমান আচরণই প্রমাণ করে, সামনে তাদের সময় খুব বেশি নেই। এই কয়েক দিনের মধ্যে তাদের অবস্থা আরও খারাপ হবে এবং তারা অস্থির হয়ে পড়েছে। ১২ তারিখ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকতে হবে, নইলে ১২ তারিখের পর হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। যদি বেশি অধৈর্য হন, তবে বসে পড়ুন।”
ঢাকা ৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার নিজ বাড়িতে এক মতবিনিময় সভায় এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমরা চাই আমাদের এলাকা সমৃদ্ধ হোক এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হোক। এখানে গ্যাসের সমস্যা রয়েছে, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন দরকার, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি আছে, এবং ইনডোর ও আউটডোর স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। আমাদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রয়োজন। আমরা আমাদের সমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত করতে চাই। আমরা যে বাংলাদেশ গড়তে চাই, তা কেবল আমাদের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের জন্য, যারা আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা ৮ আসনে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ কাকরাইলের সেন্ট মেরী’স ক্যাথলিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, “ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেই বাংলাদেশকে সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে কেউ সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, আমরা সবাই সমান অধিকারসম্পন্ন বাংলাদেশি নাগরিক। ইসলাম ধর্মে স্পষ্টভাবে বলা আছে—যার যার ধর্ম তার তার কাছে এবং কোনো ধর্মে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। সেই শিক্ষার ভিত্তিতেই বাংলাদেশে সবাই মিলেমিশে বসবাস করছে। মাঝে মাঝে কিছু কুচক্রী মহল বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করলেও সম্মিলিতভাবে তা প্রতিহত করা হয়।” তিনি পরে কাকরাইল এলাকায় গণসংযোগ করেন এবং শান্তিনগর শেলটেক রহমান ভিলায় ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ঢাকা-১৬ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আমিনুল হক মিরপুর-১১ ও আদর্শ নগর এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন, “অসহায় মানুষকে টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা চলছে। শবে বরাতের আগে রাতে প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে খাবার ও চাল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়লে তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়। একটি অশুভ চক্র বিভ্রান্তিমূলক তথ্য এবং অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। উসকানিদাতা ও বিশৃঙ্খলাকারীদের বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি। সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। মিথ্যাচার বা প্রলোভনে তারা পা দেবে না। আমরা আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় আছি।”
ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক রাজধানীর শিয়া মসজিদ থেকে শ্যামলী এলাকায় ছাত্রশিবির আয়োজিত এক ‘নির্বাচনি স্বাগত মিছিল’ এ অংশ নিয়ে বলেন, “আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যেকোনো ধরনের কারচুপি বা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ রুখতে ছাত্র জনতাকে রাজপথে অতন্দ্র প্রহরীর মতো প্রস্তুত থাকতে হবে। ভোট দিয়ে ঘরে ফিরে গেলে চলবে না, বরং ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত কেন্দ্র ও রাজপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে।”
জামায়াতের ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে মিরপুর-১০ এ অবস্থিত প্রধান নির্বাচন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, “আগামী কয়েকটা দিন আপ্রাণ চেষ্টা করে আমীরে জামায়াতকে নির্বাচিত করতে হবে। তাকে নির্বাচিত করতে পারলে আগামী পাঁচটি বছর ভালো থাকা যাবে। প্রচার ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই সামান্য উত্তেজনা তৈরি করা যাবে না। ভোটের দিন কোনো অবস্থাতেই রক্ত গরম করা যাবে না, কিন্তু সাহস রাখতে হবে। প্রয়োজনে আমরা জীবন দেব, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কেন্দ্র ছেড়ে যাবো না, ইনশাআল্লাহ।”
ঢাকা-১৬ আসনের জামায়াতের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুল বাতেন মিরপুর-১২ ও মোল্লা মার্কেটসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন, “সারা দেশে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে বসে আছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ১২ তারিখে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। আমাদের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। এসব হুমকি-ধামকি দেখিয়ে আমাদের পরাজিত করা যাবে না। কারণ বিগত সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কোনো রক্তচক্ষুর সামনে মাথা নত করেনি, সামনেও করবে না, ইনশাআল্লাহ।”
রিপোর্টারের নাম 





















