ঢাকা ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

তফশিল ঘোষণার ৩৬ দিনে ১৫ নেতাকর্মী নিহত: টিআইবির প্রতিবেদনে নির্বাচনি সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪১:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচনি পরিবেশে সহিংসতা, রাজনৈতিক হয়রানি, প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনাগুলো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহ পরিসংখ্যান: টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০২ জন। নির্বাচনি তফশিল ঘোষণার পর থেকে এই সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়েছে। টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অন্তত ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ সহিংসতার ঝুঁকিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

নিরাপত্তা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন: প্রতিবেদনে নির্বাচনি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। টিআইবি জানায়, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মধ্যে মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য রয়েছেন, যা একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচনের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি, বিশেষ করে গত তিনটি নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী কর্মকর্তাদের পুরোপুরি বাদ না দেওয়া এবং উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো ইতোমধ্যেই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

নির্বাচন কমিশনের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ: টিআইবির প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন জমা পড়া এবং প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে অনুপযোগী থাকা নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। এছাড়া ইসি প্রাথমিকভাবে যে ৭৩টি সংস্থাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে বাছাই করেছে, সেগুলোর অনেকগুলোর সক্ষমতা বা নিরপেক্ষতা নিয়ে টিআইবি সংশয় প্রকাশ করেছে। হলফনামার তথ্য যাচাই এবং ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রেও কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এসেছে।

মব ভায়োলেন্স ও অপতত্ত্বের ঝুঁকি: টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “মব সহিংসতা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।” তিনি অভিযোগ করেন, মব সংস্কৃতির উৎপত্তি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু থেকেও হয়েছে, যা সরকারের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা ডিপফেক ব্যবহার করে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো এবারের নির্বাচনের জন্য অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে টিআইবি, কিন্তু কমিশনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজধানীর ছয় থানা এলাকায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৬০ জন গ্রেপ্তার

তফশিল ঘোষণার ৩৬ দিনে ১৫ নেতাকর্মী নিহত: টিআইবির প্রতিবেদনে নির্বাচনি সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র

আপডেট সময় : ০১:৪১:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই তথ্য তুলে ধরা হয়। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচনি পরিবেশে সহিংসতা, রাজনৈতিক হয়রানি, প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনাগুলো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহ পরিসংখ্যান: টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০২ জন। নির্বাচনি তফশিল ঘোষণার পর থেকে এই সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়েছে। টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অন্তত ১ হাজার ৩৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ সহিংসতার ঝুঁকিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

নিরাপত্তা ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন: প্রতিবেদনে নির্বাচনি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। টিআইবি জানায়, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মধ্যে মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য রয়েছেন, যা একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচনের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত নয়। এছাড়া মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি, বিশেষ করে গত তিনটি নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী কর্মকর্তাদের পুরোপুরি বাদ না দেওয়া এবং উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো ইতোমধ্যেই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

নির্বাচন কমিশনের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ: টিআইবির প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন জমা পড়া এবং প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে অনুপযোগী থাকা নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। এছাড়া ইসি প্রাথমিকভাবে যে ৭৩টি সংস্থাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে বাছাই করেছে, সেগুলোর অনেকগুলোর সক্ষমতা বা নিরপেক্ষতা নিয়ে টিআইবি সংশয় প্রকাশ করেছে। হলফনামার তথ্য যাচাই এবং ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রেও কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এসেছে।

মব ভায়োলেন্স ও অপতত্ত্বের ঝুঁকি: টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “মব সহিংসতা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এটি নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।” তিনি অভিযোগ করেন, মব সংস্কৃতির উৎপত্তি অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু থেকেও হয়েছে, যা সরকারের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা ডিপফেক ব্যবহার করে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো এবারের নির্বাচনের জন্য অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে টিআইবি, কিন্তু কমিশনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে।