ঢাকা ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

পাকিস্তানে ভিন্নমত দমনের তীব্রতা বৃদ্ধি: কারাবন্দী ইমরান খান থেকে মানবাধিকার কর্মী ও গণমাধ্যমও নিশানায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

পাকিস্তানে ভিন্নমত দমনের প্রক্রিয়া ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপরও কঠোর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সম্প্রতি একজন প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবীর ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ দেশটির মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে ভিন্নমতের কণ্ঠরোধে এক নতুন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে।

ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দাবি করেছে, গত পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কোনো দর্শনার্থী দেখা করতে পারেননি। তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমরান খানের বার্তা বিশ্বের কাছে পৌঁছানো বন্ধ করার জন্যই এমনটি করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে তারা দেশটির সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দায়ী করছেন। তবে সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইমরান খান জেলের ভেতরে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ থাকার নিয়ম ভঙ্গ করেছেন, তাই তার বৈঠক বন্ধ করা হয়েছে।

ইমরান খানের বোন আলেইমা খানম সম্প্রতি রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সমর্থকদের বিক্ষোভে বলেন, “টেলিভিশনে দুটি নাম থাকতে পারে না। ইমরান খান সম্পর্কে ভালো কিছু বলা যাবে না, আর আসিম মুনির সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা যাবে না।” তার দলের দাবি, পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে আট সপ্তাহের বেশি এবং আইনজীবীর সঙ্গে পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তার দেখা হয়নি, যেখানে আইনজীবীর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎটি হয়েছিল মাত্র আট মিনিটের জন্য। খানমের মতে, আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তার মৌলিক অধিকার। কারাগারের ভেতরে বৈঠকের পর ইমরান খানের বক্তব্য প্রায়শই তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হতো, যা তার দল ও সমর্থকদের কাছে নির্দেশনার উৎস ছিল। এসব বার্তা প্রায়শই সরকার ও সামরিক বাহিনীর জন্য তীব্র সমালোচনামূলক ছিল।

২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দী ইমরান খান বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, যদিও তিনি এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী অবশ্য ইমরান খানকে ‘একঘরে’ করে রাখার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী তাকে জিমের সরঞ্জাম এবং একজন রাঁধুনিসহ ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত বন্দী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ইমরান খানের এক্স অ্যাকাউন্টে সামরিক প্রধান আসিম মুনিরকে উদ্দেশ্য করে একটি বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশিত হওয়ার পর, সামরিক মুখপাত্র পাকিস্তানের গণমাধ্যমে দুই ঘণ্টার একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি রাজনীতির বাইরে গিয়ে ইমরান খানকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা দেশটিকে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তিনি এটিকে বেসামরিক শাসনকালে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ দমন-পীড়ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দেশটির রাজনীতিতে একটি চিরস্থায়ী উপাদান হিসেবে বিবেচিত, যা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সামরিক একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে, ইমরান খান এবং সেনাবাহিনী ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয়েছিল; অনেকেই বিশ্বাস করেন যে সেনাবাহিনীর সমর্থন তাকে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছিল।

গত সপ্তাহে মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি এবং তার স্বামীকে রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পাকিস্তানের কাছে ভিন্নমত দমন এবং মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা ব্যক্তিদের ওপর জোর প্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল।

সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ ক্রমশ সীমিত হচ্ছে এবং ঝুঁকিও বাড়ছে। পাকিস্তানের মানবাধিকার কাউন্সিল (এইচআরসিপি) জানিয়েছে, তাদের কর্মীদের ফোনে হয়রানি করা হচ্ছে এবং আগাম অনুমতি না নিলে হোটেলে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে। সরকার অবশ্য ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য’ এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে।

গণমাধ্যম কর্মীদেরও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। ২০২৩ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছিল, টিভি চ্যানেলগুলোকে ইমরান খানের মুখ, তার কণ্ঠস্বর কিংবা তার নামও প্রচার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাংবাদিক জানিয়েছেন, কোন বিষয়গুলো কাভার করা যাবে না তার তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে। জিও টিভির রিপোর্টার আজাজ সাঈদ বলেন, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্ক আছে—এমন যেকোনো খবর প্রকাশ করলেই সতর্কবার্তা আসে। তিনি আরও বলেন, মূলধারার গণমাধ্যম অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।

মুনিজা জাহাঙ্গীর, একজন সাংবাদিক এবং পাকিস্তানের মানবাধিকার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি, বলেন, গণমাধ্যমে প্রতিবাদের জায়গা কতটা থাকবে তা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী বেশি প্রভাবশালী হলে ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কম থাকে।

১৯৪১ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রাচীনতম সংবাদপত্র ‘ডন’ তার প্রতিবেদনের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ডিসেম্বর মাসে ডন মিডিয়া গ্রুপ জানায়, হঠাৎ করে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; প্রথমে পত্রিকায়, পরে তাদের টিভি ও রেডিও মাধ্যমে। সংবাদপত্র সম্পাদকদের পরিষদ একে ‘প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া’ বলে অভিহিত করেছে।

একাধিক সাংবাদিক বলেছেন, ২০২৫ সালের শুরুতে পাকিস্তানের প্রিভেনশন অব ইলেকট্রনিক ক্রাইমস অ্যাক্ট (পিইসিএ)-এ আনা পরিবর্তন পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে ‘ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলায়, যা সামরিক বাহিনী বহুবার উল্লেখ করেছে—অর্থাৎ রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে ‘অরাজকতা ও ভুয়া তথ্য’ ছড়ানো। নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের সংবিধান যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতার আওতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, “পাকিস্তান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করে—এ দাবি ভিত্তিহীন।” তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি ও সন্ত্রাসী নিয়োগের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়মের মধ্যে আনতে চাই, গোটা দুনিয়াই এটি করছে।”

তবে ইসলামাবাদভিত্তিক গণমাধ্যম বিশ্লেষক আদনান রেহমাত বলেন, এসব নিয়ম সাংবাদিকদের রিপোর্টিংয়ের ক্ষমতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে। তিনি বলেন, আইনে পরিবর্তন এনে এখন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বা বিচার বিভাগের সমালোচনা করাকে স্পষ্টতই অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞা আরও অস্পষ্ট হয়েছে। জরিমানার অঙ্ক বিস্ময়করভাবে বেশি এবং শাস্তিও অসমভাবে বাড়ানো হয়েছে।

পাকিস্তানে সাংবাদিকদের ওপর সীমাবদ্ধতা নতুন নয়। ইমরান খানের সরকার আমলেও সাংবাদিকরা প্রকাশনা ও সম্প্রচারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এবার ভিন্নমত দমনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। ইসলামাবাদভিত্তিক সংঘাত, অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা নিয়ে কাজ করা এক গবেষণার পরিচালক আজিমা চীমা বলেন, “এবার আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত পন্থা নয় এটি।”

দেশের বাইরে অনলাইনে কাজ করা ব্যক্তিরাও কর্তৃপক্ষের নজরে আছেন। জানুয়ারির শুরুতে সাতজন পাকিস্তানি সাংবাদিক ও ইউটিউবার—যাদের মধ্যে দুইজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা—তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার শেষে ‘ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ’-এর অভিযোগে যাবজ্জীবন দণ্ড পান। ২০২৩ সালের ৯ই মে ইমরান খানের প্রথম গ্রেপ্তারের পর হওয়া বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে অভিযোগ আনা হয় যে তারা ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ ও ‘উসকানি’ দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের একজন, আদিল রাজা, এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছেন, ‘ক্ষমতাবানদের সামনে সত্য বলাকে এখন পাকিস্তানে ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ বলা হচ্ছে।’ আজিমা চীমা বলেন, “ধীরে ধীরে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে রাষ্ট্র কঠোরভাবে এবং বিন্দুমাত্র দুঃখপ্রকাশ না করে কঠোর শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত।” এর পর সেই কঠোরতা কার ওপর নেমে আসবে—এটাই এখন অনেকে বোঝার চেষ্টা করছেন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নোয়াখালীর প্রবাসীর মৃত্যু, আহত ২

পাকিস্তানে ভিন্নমত দমনের তীব্রতা বৃদ্ধি: কারাবন্দী ইমরান খান থেকে মানবাধিকার কর্মী ও গণমাধ্যমও নিশানায়

আপডেট সময় : ০৬:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

পাকিস্তানে ভিন্নমত দমনের প্রক্রিয়া ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের ওপরও কঠোর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সম্প্রতি একজন প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবীর ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং গণমাধ্যম কর্মীদের ওপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ দেশটির মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র ও সামরিক বাহিনীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে ভিন্নমতের কণ্ঠরোধে এক নতুন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে।

ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দাবি করেছে, গত পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কোনো দর্শনার্থী দেখা করতে পারেননি। তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমরান খানের বার্তা বিশ্বের কাছে পৌঁছানো বন্ধ করার জন্যই এমনটি করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে তারা দেশটির সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দায়ী করছেন। তবে সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইমরান খান জেলের ভেতরে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ থাকার নিয়ম ভঙ্গ করেছেন, তাই তার বৈঠক বন্ধ করা হয়েছে।

ইমরান খানের বোন আলেইমা খানম সম্প্রতি রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সমর্থকদের বিক্ষোভে বলেন, “টেলিভিশনে দুটি নাম থাকতে পারে না। ইমরান খান সম্পর্কে ভালো কিছু বলা যাবে না, আর আসিম মুনির সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা যাবে না।” তার দলের দাবি, পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে আট সপ্তাহের বেশি এবং আইনজীবীর সঙ্গে পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তার দেখা হয়নি, যেখানে আইনজীবীর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎটি হয়েছিল মাত্র আট মিনিটের জন্য। খানমের মতে, আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তার মৌলিক অধিকার। কারাগারের ভেতরে বৈঠকের পর ইমরান খানের বক্তব্য প্রায়শই তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হতো, যা তার দল ও সমর্থকদের কাছে নির্দেশনার উৎস ছিল। এসব বার্তা প্রায়শই সরকার ও সামরিক বাহিনীর জন্য তীব্র সমালোচনামূলক ছিল।

২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দী ইমরান খান বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, যদিও তিনি এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী অবশ্য ইমরান খানকে ‘একঘরে’ করে রাখার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী তাকে জিমের সরঞ্জাম এবং একজন রাঁধুনিসহ ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত বন্দী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ইমরান খানের এক্স অ্যাকাউন্টে সামরিক প্রধান আসিম মুনিরকে উদ্দেশ্য করে একটি বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশিত হওয়ার পর, সামরিক মুখপাত্র পাকিস্তানের গণমাধ্যমে দুই ঘণ্টার একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি রাজনীতির বাইরে গিয়ে ইমরান খানকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা দেশটিকে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তিনি এটিকে বেসামরিক শাসনকালে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ দমন-পীড়ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দেশটির রাজনীতিতে একটি চিরস্থায়ী উপাদান হিসেবে বিবেচিত, যা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সামরিক একনায়কতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে, ইমরান খান এবং সেনাবাহিনী ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয়েছিল; অনেকেই বিশ্বাস করেন যে সেনাবাহিনীর সমর্থন তাকে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছিল।

গত সপ্তাহে মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি এবং তার স্বামীকে রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পাকিস্তানের কাছে ভিন্নমত দমন এবং মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা ব্যক্তিদের ওপর জোর প্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল।

সাংবাদিক, বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ ক্রমশ সীমিত হচ্ছে এবং ঝুঁকিও বাড়ছে। পাকিস্তানের মানবাধিকার কাউন্সিল (এইচআরসিপি) জানিয়েছে, তাদের কর্মীদের ফোনে হয়রানি করা হচ্ছে এবং আগাম অনুমতি না নিলে হোটেলে গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করতে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে। সরকার অবশ্য ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য’ এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করছে।

গণমাধ্যম কর্মীদেরও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। ২০২৩ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছিল, টিভি চ্যানেলগুলোকে ইমরান খানের মুখ, তার কণ্ঠস্বর কিংবা তার নামও প্রচার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাংবাদিক জানিয়েছেন, কোন বিষয়গুলো কাভার করা যাবে না তার তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে। জিও টিভির রিপোর্টার আজাজ সাঈদ বলেন, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্ক আছে—এমন যেকোনো খবর প্রকাশ করলেই সতর্কবার্তা আসে। তিনি আরও বলেন, মূলধারার গণমাধ্যম অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।

মুনিজা জাহাঙ্গীর, একজন সাংবাদিক এবং পাকিস্তানের মানবাধিকার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি, বলেন, গণমাধ্যমে প্রতিবাদের জায়গা কতটা থাকবে তা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী বেশি প্রভাবশালী হলে ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কম থাকে।

১৯৪১ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রাচীনতম সংবাদপত্র ‘ডন’ তার প্রতিবেদনের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ডিসেম্বর মাসে ডন মিডিয়া গ্রুপ জানায়, হঠাৎ করে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; প্রথমে পত্রিকায়, পরে তাদের টিভি ও রেডিও মাধ্যমে। সংবাদপত্র সম্পাদকদের পরিষদ একে ‘প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া’ বলে অভিহিত করেছে।

একাধিক সাংবাদিক বলেছেন, ২০২৫ সালের শুরুতে পাকিস্তানের প্রিভেনশন অব ইলেকট্রনিক ক্রাইমস অ্যাক্ট (পিইসিএ)-এ আনা পরিবর্তন পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে ‘ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলায়, যা সামরিক বাহিনী বহুবার উল্লেখ করেছে—অর্থাৎ রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে ‘অরাজকতা ও ভুয়া তথ্য’ ছড়ানো। নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের সংবিধান যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতার আওতায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, “পাকিস্তান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করে—এ দাবি ভিত্তিহীন।” তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আর্থিক জালিয়াতি ও সন্ত্রাসী নিয়োগের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়মের মধ্যে আনতে চাই, গোটা দুনিয়াই এটি করছে।”

তবে ইসলামাবাদভিত্তিক গণমাধ্যম বিশ্লেষক আদনান রেহমাত বলেন, এসব নিয়ম সাংবাদিকদের রিপোর্টিংয়ের ক্ষমতা সীমিত করতে ব্যবহৃত হতে পারে। তিনি বলেন, আইনে পরিবর্তন এনে এখন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বা বিচার বিভাগের সমালোচনা করাকে স্পষ্টতই অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থের সংজ্ঞা আরও অস্পষ্ট হয়েছে। জরিমানার অঙ্ক বিস্ময়করভাবে বেশি এবং শাস্তিও অসমভাবে বাড়ানো হয়েছে।

পাকিস্তানে সাংবাদিকদের ওপর সীমাবদ্ধতা নতুন নয়। ইমরান খানের সরকার আমলেও সাংবাদিকরা প্রকাশনা ও সম্প্রচারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। তবে সমালোচকরা মনে করেন, এবার ভিন্নমত দমনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। ইসলামাবাদভিত্তিক সংঘাত, অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা নিয়ে কাজ করা এক গবেষণার পরিচালক আজিমা চীমা বলেন, “এবার আদালতকে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত পন্থা নয় এটি।”

দেশের বাইরে অনলাইনে কাজ করা ব্যক্তিরাও কর্তৃপক্ষের নজরে আছেন। জানুয়ারির শুরুতে সাতজন পাকিস্তানি সাংবাদিক ও ইউটিউবার—যাদের মধ্যে দুইজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা—তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার শেষে ‘ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ’-এর অভিযোগে যাবজ্জীবন দণ্ড পান। ২০২৩ সালের ৯ই মে ইমরান খানের প্রথম গ্রেপ্তারের পর হওয়া বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে অভিযোগ আনা হয় যে তারা ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ ও ‘উসকানি’ দিয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের একজন, আদিল রাজা, এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছেন, ‘ক্ষমতাবানদের সামনে সত্য বলাকে এখন পাকিস্তানে ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ বলা হচ্ছে।’ আজিমা চীমা বলেন, “ধীরে ধীরে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে রাষ্ট্র কঠোরভাবে এবং বিন্দুমাত্র দুঃখপ্রকাশ না করে কঠোর শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত।” এর পর সেই কঠোরতা কার ওপর নেমে আসবে—এটাই এখন অনেকে বোঝার চেষ্টা করছেন।