ঢাকা ০১:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়: ৫১৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২৩ বার পড়া হয়েছে

প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও আন্তর্জাতিক দরকষাকষি শেষে কানাডীয় বহুজাতিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেছে বাংলাদেশ। সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা (ছাতক) গ্যাসক্ষেত্রে সংগঠিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় নাইকোকে প্রায় ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (আইসিএসআইডি)। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৫১৬ কোটি টাকারও বেশি। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাতে পেট্রোবাংলা সূত্রে এই যুগান্তকারী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। মূলত গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর এই রায় ঘোষণা করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্প্রতি চূড়ান্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় দুটি গ্যাসক্ষেত্রে যে বিধ্বংসী বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার জন্য একমাত্র নাইকোর চরম অবহেলা ও কারিগরি ত্রুটিই দায়ী ছিল। আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, নাইকো ড্রিলিং করার সময় প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল, যা এই দুর্ঘটনার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল অপচয়, ভূগর্ভস্থ সম্পদের ক্ষতি এবং স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করেই এই ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে। সে সময় ছাতক বা টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ড্রিলিং কার্যক্রম চালানোর সময় পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে গ্যাসক্ষেত্রটিতে কয়েক মাস ধরে আগুন জ্বলেছিল এবং দেশের অমূল্য গ্যাস সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছিল। তবে নাইকো শুরু থেকেই নিজেদের দায় অস্বীকার করে আসছিল এবং এক পর্যায়ে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। সেই থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে আসছিল।

আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা জাস মুন্ডি (Jus Mundi) এবং আইসিএসআইডি এই রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন হিসেবে বর্ণনা করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা ও উদাহরণ হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করেছে যে, কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানি যদি উন্নয়নশীল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বা পরিবেশের ক্ষতি করে, তবে তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সরাসরি জবাবদিহিতার মুখে আনা সম্ভব। এই জয় শুধু আর্থিক প্রাপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে একটি বড় নৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

নাইকোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়: ৫১৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও আন্তর্জাতিক দরকষাকষি শেষে কানাডীয় বহুজাতিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেসের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেছে বাংলাদেশ। সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা (ছাতক) গ্যাসক্ষেত্রে সংগঠিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় নাইকোকে প্রায় ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (আইসিএসআইডি)। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৫১৬ কোটি টাকারও বেশি। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাতে পেট্রোবাংলা সূত্রে এই যুগান্তকারী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। মূলত গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর এই রায় ঘোষণা করা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্প্রতি চূড়ান্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় দুটি গ্যাসক্ষেত্রে যে বিধ্বংসী বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার জন্য একমাত্র নাইকোর চরম অবহেলা ও কারিগরি ত্রুটিই দায়ী ছিল। আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, নাইকো ড্রিলিং করার সময় প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল, যা এই দুর্ঘটনার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল অপচয়, ভূগর্ভস্থ সম্পদের ক্ষতি এবং স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবেচনা করেই এই ৪২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে। সে সময় ছাতক বা টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ড্রিলিং কার্যক্রম চালানোর সময় পরপর দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে গ্যাসক্ষেত্রটিতে কয়েক মাস ধরে আগুন জ্বলেছিল এবং দেশের অমূল্য গ্যাস সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয় এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসে। সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছিল। তবে নাইকো শুরু থেকেই নিজেদের দায় অস্বীকার করে আসছিল এবং এক পর্যায়ে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ঠুকে দেয়। সেই থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে আসছিল।

আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা জাস মুন্ডি (Jus Mundi) এবং আইসিএসআইডি এই রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন হিসেবে বর্ণনা করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা ও উদাহরণ হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করেছে যে, কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানি যদি উন্নয়নশীল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বা পরিবেশের ক্ষতি করে, তবে তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সরাসরি জবাবদিহিতার মুখে আনা সম্ভব। এই জয় শুধু আর্থিক প্রাপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াইয়ে একটি বড় নৈতিক বিজয় হিসেবে গণ্য হচ্ছে।