ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার চতুর্থ দিনে এসে রাজপথের উত্তাপ এখন নির্বাচনি জনসভা ও পথসভাগুলোতে আছড়ে পড়ছে। গত রোববার (২৫ জানুয়ারি) দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা ভোটারদের মন জয়ে যেমন নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তেমনি একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরেছেন। নির্বাচনি প্রচারণার এই পর্বে একদিকে বড় দলগুলো ক্ষমতা ও শাসনের শুদ্ধাচার নিয়ে সরব রয়েছে, অন্যদিকে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ না থাকার অভিযোগে নতুন গণআন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, ভোট গ্রহণ এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রচারণার মাঠ যেমন মুখর হচ্ছে, তেমনি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বিচ্ছিন্ন সংঘাতের খবরে।
তারেক রহমানের কড়া বার্তা: দুর্নীতিবাজদের ছাড় নেই রবিবার সকালে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক পলোগ্রাউন্ড মাঠে এক বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০ বছর পর চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিয়ে তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুশল বিনিময় করে সমর্থকদের আবেগ ছুঁয়ে যান। তাঁর বক্তব্যে মূল লক্ষ্য ছিল দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন। তারেক রহমান বলেন, “একটি পক্ষ বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত। আমরা মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করি। আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতিবাজদের কোনো ছাড় নেই।” তিনি ভোটারদের শুধু ভোট দিয়েই দায়িত্ব শেষ না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ভোট শেষে কেন্দ্র আর ব্যালট বাক্স পাহারা দিতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না।” চট্টগ্রামের এই জনসভা শেষে তিনি ফেনী ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামসহ একাধিক স্থানে পথসভা করেন।
চাঁদাবাজদের ‘লাল কার্ড’ দেখানোর ঘোষণা জামায়াত আমিরের একই দিনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলার পাড়, ধূপখোলা মাঠ ও পুরান ঢাকায় পৃথক তিনটি জনসভায় বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি প্রতিপক্ষের প্রতি ইঙ্গিত করে চাঁদাবাজদের কঠোর সতর্কবার্তা দেন। জামায়াত আমির বলেন, “দেশে এখন চাঁদাবাজি একটি পেশা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। যারা এই নোংরা পেশায় আছেন, ভালো পথে ফিরে আসুন; আমরা আপনাদের হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দেবো। অন্যথায় আপনাদের লাল কার্ড দেখানো হবে।” তিনি আরও সতর্ক করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণ ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। আমীরে জামায়াত তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, “আপনার ভোট আপনি দেবেন, আমারটা আমি—এই অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে।”

নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ ও আন্দোলনের আশঙ্কা নির্বাচনি প্রচারণার সমান্তরালে পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা। ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তাঁর নির্বাচনি এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন, “নির্বাচনে এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি।” তিনি ভোটারদের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে দেখা করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-র চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি অভিযোগ করেন যে, মাঠপর্যায়ের প্রশাসন এখনও পক্ষপাতদুষ্ট এবং অনেক জায়গায় আচরণবিধি মানা হচ্ছে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে দেশ আরেকটি বড় গণআন্দোলনের মুখে পড়তে পারে।”

মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মির্জা আব্বাসের অঙ্গীকার ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস শাহজাহানপুর ও কাঁকরাইল এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকাকে মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত করার অগ্রাধিকার দিয়েছেন। মির্জা আব্বাস বলেন, “এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে হবে, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস একেবারে বন্ধ করতে হবে। আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।” তবে নির্বাচনের আগে ‘কিছু একটা গরমিল’ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন যে, বিশেষ কোনো শক্তি ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে পারে। তবে তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে, জনগণ এমন যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে।
মাঠের চিত্র: বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগ প্রচারণার চতুর্থ দিনে এসে লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা এবং ময়মনসিংহের ভালুকায় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। লালমনিরহাট-১ এবং চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২৮ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের ভালুকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফখর উদ্দিন বাচ্চু এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোর্শেদ আলমের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। সব মিলিয়ে প্রচারণার মাঠ যত সরগরম হচ্ছে, সংঘাতের শঙ্কা ততটাই বাড়ছে।
রিপোর্টারের নাম 























