ঢাকা ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের মতো নতুন সরকার যেন বেইমানি না করে: জুলাই শহীদ পরিবার

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার ও গুরুতর আহতদের সঙ্গে বিএনপির মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা অভিযোগ করেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারই আজ শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। গতকাল রোববার রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বিএনপি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সভাপতিত্ব করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। দর্শকের সারিতে অন্যদের সঙ্গে ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমান। সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাঁদের বক্তব্যে বেদনা, ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরেন। বিচারহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা ও চিকিৎসা-সংকটের কথা উঠে আসে প্রায় সব বক্তব্যেই।

ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তার মা শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর হত্যাকা-ের বিচারের আশা করেছিলাম। এখন সেই আশা ভেঙে গেছে। শাফিকের খুনিরা ঘরে ঘুমাচ্ছে। তাদের বিচার হয়নি।’ বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মতো নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার যেন বেইমানি না করে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদের যাতে একই নজরে দেখা হয়। সব পরিবারের সদস্যদের যাতে সমান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরার চাপড়া মসজিদ এয়ারপোর্ট এলাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আবদুল্লাহ বিন জাহিদ। এই শহীদের মা ফাতেমা তুজ-জোহরা বলেন, বড় ছেলে জাহিদের মৃত্যুর ছয় মাস পর তার বাবা মারা গেছেন। তার ছোট ছেলে জিসান কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। ছোট ছেলের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সঙ্গে তিনবার সাক্ষাৎ করেছেন। চিকিৎসা সহায়তা পেতে একদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষাও করেছিলেন। কিন্তু কোনো সহায়তা পাননি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে ছোট ছেলের চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সহায়তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যাতে বিচারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়, সেই অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। শহীদ ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়ার বড় ভাই রবিউল আওয়াল ভূঁইয়া বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় গেছে, তারা এখন আর শহীদ পরিবারের খবর নেয় না। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়ার সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতরভাবে বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

শহীদ গোলাম নাফিসের বাবা গোলাম রহমান বলেন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক শহীদ পরিবার চরম দুর্ভোগে রয়েছে। বিচার না পাওয়ার হতাশা থেকে একজন শহীদকন্যা আত্মহত্যা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও দেড় বছরেও দৃশ্যমান কোনো বিচার হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তিনি কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষে নয়, শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর সম্মান ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার কথা বলতে এসেছেন। তিনি আহত ও নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণের আহ্বান জানান। শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে যে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রথম শহীদ ছিলেন তার ভাই। প্রকাশ্যে হত্যার ভিডিও প্রচারিত হলেও এখনো বিচার হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় এলে শহীদদের বিচার, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে এমনটাই আশা প্রকাশ করছি।

অনুষ্ঠানে আহত ব্যক্তিরাও বক্তব্য দেন। তারা জানান, অনেকেই হাত-পা হারিয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। অথচ উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। সভা শেষে শহীদ পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকা-ের বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন যেন নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয় এবং আর কোনো বেইমানি যেন না ঘটে, সেই দাবি জানানো হয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকা বিমানবন্দরে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আটক: হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি

অন্তর্বর্তী সরকারের মতো নতুন সরকার যেন বেইমানি না করে: জুলাই শহীদ পরিবার

আপডেট সময় : ০১:০৭:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার ও গুরুতর আহতদের সঙ্গে বিএনপির মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা অভিযোগ করেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকারই আজ শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। গতকাল রোববার রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বিএনপি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। সভাপতিত্ব করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। দর্শকের সারিতে অন্যদের সঙ্গে ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমান। সভায় শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাঁদের বক্তব্যে বেদনা, ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরেন। বিচারহীনতা, নিরাপত্তাহীনতা ও চিকিৎসা-সংকটের কথা উঠে আসে প্রায় সব বক্তব্যেই।

ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তার মা শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর হত্যাকা-ের বিচারের আশা করেছিলাম। এখন সেই আশা ভেঙে গেছে। শাফিকের খুনিরা ঘরে ঘুমাচ্ছে। তাদের বিচার হয়নি।’ বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মতো নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে নতুন সরকার যেন বেইমানি না করে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদের যাতে একই নজরে দেখা হয়। সব পরিবারের সদস্যদের যাতে সমান দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট উত্তরার চাপড়া মসজিদ এয়ারপোর্ট এলাকায় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আবদুল্লাহ বিন জাহিদ। এই শহীদের মা ফাতেমা তুজ-জোহরা বলেন, বড় ছেলে জাহিদের মৃত্যুর ছয় মাস পর তার বাবা মারা গেছেন। তার ছোট ছেলে জিসান কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। ছোট ছেলের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সঙ্গে তিনবার সাক্ষাৎ করেছেন। চিকিৎসা সহায়তা পেতে একদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষাও করেছিলেন। কিন্তু কোনো সহায়তা পাননি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে ছোট ছেলের চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সহায়তা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে যাতে বিচারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়, সেই অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। শহীদ ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়ার বড় ভাই রবিউল আওয়াল ভূঁইয়া বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় গেছে, তারা এখন আর শহীদ পরিবারের খবর নেয় না। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলা পদচারী-সেতুর কাছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়ার সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতরভাবে বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।

শহীদ গোলাম নাফিসের বাবা গোলাম রহমান বলেন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার অভাবে অনেক শহীদ পরিবার চরম দুর্ভোগে রয়েছে। বিচার না পাওয়ার হতাশা থেকে একজন শহীদকন্যা আত্মহত্যা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও দেড় বছরেও দৃশ্যমান কোনো বিচার হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তিনি কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষে নয়, শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর সম্মান ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার কথা বলতে এসেছেন। তিনি আহত ও নিহত পরিবারগুলোর সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণের আহ্বান জানান। শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে যে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রথম শহীদ ছিলেন তার ভাই। প্রকাশ্যে হত্যার ভিডিও প্রচারিত হলেও এখনো বিচার হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় এলে শহীদদের বিচার, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে এমনটাই আশা প্রকাশ করছি।

অনুষ্ঠানে আহত ব্যক্তিরাও বক্তব্য দেন। তারা জানান, অনেকেই হাত-পা হারিয়ে আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। অথচ উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। সভা শেষে শহীদ পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকা-ের বিচার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন যেন নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয় এবং আর কোনো বেইমানি যেন না ঘটে, সেই দাবি জানানো হয়।