## নড়াইল-১ আসন: বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও জামায়াতের আশাবাদ
নড়াইল, [আজকের তারিখ]: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নড়াইল-১ আসনের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল উত্তেজনা। আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করতে দিনরাত এক করে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন তারা, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
এই আসনে মোট ১৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও, বাছাই পর্ব শেষে পাঁচজনের মনোনয়ন বৈধতা পেয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, জামায়াতে ইসলামীর মো. ওবায়দুল্লাহ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. আব্দুর রহমান, জাতীয় পার্টির মো. মিল্টন মোল্যা এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বিএম নাগিব হোসেন।
বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ বিভেদ জামায়াতের জন্য আশার আলো
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান জামায়াতে ইসলামীর জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। যদিও আসনটির জয়-পরাজয় নির্ধারণে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তবে বিএনপি নেতারা এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে তাদের পক্ষে সৃষ্ট গণজোয়ারের দাবি করছেন। অন্যদিকে, জামায়াত বলছে, ভোটাররা ভালো-মন্দের বিচার করে তাদের দিকেই ঝুঁকছে এবং শেষ পর্যন্ত তারাই বিজয়ী হবে।
উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ ও ভোটারদের প্রত্যাশা
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও এই জনপদের মানুষের জীবনমানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তাদের মতে, ক্ষমতাসীনরা শুধু নিজেদের ভাগ্যই গড়েছে, অথচ কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতসহ নানা ক্ষেত্রে এই এলাকা আজও উন্নয়নবঞ্চিত।
বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর উত্থান
নড়াইল-১ আসনে বিএনপি’র জেলা সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ভোটারদের মন জয় করতে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে, কালিয়া উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে গত ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় বিএনপি দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভেদের জেরে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি সরদার আনোয়ার হোসেন ও পৌর বিএনপি’র বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সেলিম রেজা ইউসুফের নেতৃত্বে দলের একাংশ বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী বিএম নাগিব হোসেনের পক্ষে কাজ করছেন।
আওয়ামী লীগের সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য বিএম কবিরুল হক মুক্তিসহ অন্যান্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিশ্বাস জাহাঙ্গীর পক্ষের করা একাধিক মামলাকেও এই আসনের ভোটারদের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
তবে, কালিয়া পৌর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ শিহাব উদ্দিন দাবি করেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা বিএনপি’র প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের এলাকায় তেমন কোনো প্রভাব নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, শেষ পর্যন্ত দলে কোনো বিভাজন থাকবে না এবং বিএম নাগিব হোসেনের প্রার্থীতা বিএনপি’র ভোটে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। তিনি বলেন, কিছু ভোট নষ্ট হলেও ধানের শীষের বিজয় অবসম্ভাবী।
বিএনপি প্রার্থী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ মেনে বিভেদ ভুলে দলের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করেছে। এবারও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সারা দেশের মতো এই আসনেও ধানের শীষের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বিগত ৩০ বছর ধরে নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর পাশে থাকায় তাদের কাছ থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার আশা প্রকাশ করেন। নির্বাচিত হলে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগ, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নদী ভাঙন রোধসহ অবহেলিত অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
জামায়াতের সুসংগঠিত প্রচারণা ও জয়ের আত্মবিশ্বাস
অন্যদিকে, বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী নিয়ে দাঁড়িপাল্লার বিজয় ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দলটি আগেভাগেই তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করে পরিকল্পিতভাবে প্রচার ও জনসংযোগে ব্যস্ত। জনহিতকর নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন এবং পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হয়েছে।
জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ওবায়দুল্লাহ জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্র ঘুরে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ব্যাপক সাড়া দেখেছেন। বিগত দিনে সাধারণ মানুষ জিম্মিদশার মধ্যে ছিল অভিযোগ করে তিনি বলেন, এবারের মুক্ত পরিবেশে ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ভোটারদের মন ও মননে জামায়াতে ইসলামী জায়গা করে নিয়েছে। ইনশাআল্লাহ, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা দাঁড়িপাল্লার পক্ষে রায় দিয়ে তাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।
নির্বাচিত হলে তিনি এলাকার মাদক নির্মূল, মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার বিকাশ, কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কাজ করবেন বলে জানান।
ভোটারদের প্রত্যাশা
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এই আসনে এমন একজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন যিনি মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ, যিনি সুখে-দুঃখে এলাকাবাসীর পাশে থাকবেন এবং এলাকার উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করবেন।
এই আসনে মোট দুই লাখ ৯৪ হাজার ১৫৫ জন ভোটার রয়েছেন। তাদের মধ্যে এক লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন পুরুষ, এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৪৮ জন নারী এবং দুজন হিজড়া ভোটার রয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 






















